Thursday, September 7, 2017

তুমি এখানে আছ: খেলাঘর > গল্প-স্বল্প > স্বপ্নস্মৃতি

স্বপ্নস্মৃতি
১)
অজয়বাবুর মন ভালো নেই।আজকাল অজয়বাবুর কীরকম যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে দিন রাত।তিনি জবলপুরে থাকেন,একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পুরনো চাকুরে।বিয়ে করেননি,বাড়ি গাড়ি কেনার দিকেও তার আগ্রহ নেই।একটা প্রাচীন বাড়ির ছোট্ট একটা কামরায় থাকেন,নিজের রান্না নিজেই করেন।অজয়বাবুর বাবা মা মারা গেছেন অনেক আগে,আত্মীয়স্বজন বলতে তেমন কেউ নেই।তিনি মিশুকে মানুষ নন,তাই বন্ধুবান্ধব ও তার বিশেষ কেউ নেই।অজয়বাবু খুব ছোটবেলায় পশ্চিমবঙ্গের কোনো গ্রাম থেকে বাবা মায়ের হাত ধরে চলে এসেছিলেন কলকাতায়।তার বাবা খুব সাধারণ চাকরি করতেন।কৈশোর আসতে না আসতেই অজয়বাবুকে অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজতে হযেছিল।কোনরকম বৈভব অথবা উল্লাসের স্বাদ থেকে জীবনে তিনি বঞ্চিত।কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবার বা চিন্তা করার অবকাশ পাননি কোনদিন,গতানুগতিক জীবনযাত্রা তার রোজকার চিন্তাভাবনায় আলোড়ন তোলেনি কোনো দিন।
কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে একটা বিশেষ ঘটনা তার চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশেষ বিশেষ সময় তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে টুকরো টুকরো কিছু ছবি।অজয়বাবুর কেবলই মনে হচ্ছে,এই আবছা দৃশ্যগুলি আসলে তার শৈশবের স্মৃতি,যা বোধহয় তিনি ছোট থাকতে তার গ্রামে দেখেছিলেন।এত বছর ধরে অজয়বাবুর শৈশবের কোনো স্মৃতিবোধই ছিল না,কোনো কথায় তিনি মনে করতে পারেন না।এমনকি কোন অজপাড়াগাঁয়ে তার বাড়ি ছিল,সেই গ্রামের নাম পর্যন্ত তার মনে নেই।এত বছর বাদে হঠাৎ করে এরকম হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাননি তিনি।ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল গত সোমবার।
সেদিন অজয়বাবু ভাত রাঁধছিলেন,হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটা গ্রাম।জমিতে ধান ফলেছে,সবুজ প্রান্তরের মাঝে হাওয়ায় দুলছে ধানের গাছগুলো।ধান জমির মাঝে আল দিয়ে দুটো ছেলে হাতে কঞ্চি নিয়ে গল্প করতে করতে যাচ্ছে।দুজনেরই বয়স অল্প,মাঝে মধ্যেই হেসে উঠছে তারা।এই দৃশ্যটুকু থাকে কয়েক মুহূর্ত মাত্র।অজয়বাবু গা করেননি,মনে কত খেয়ালই তো আসে।কিন্তু পরেরদিন সেই একই দৃশ্য দেখতে পান তিনি,এবার কিন্তু স্বপ্নে।তারপর থেকে প্রায় একভাবে নানা দৃশ্য হঠাৎ হঠাৎ করে ভেসে উঠছে,তার চোখের সামনে,ঘুমে অথবা জাগা অবস্থায়।রবিবার দুপুরে তার একটু তন্দ্রাভাব এসেছিল,স্বপ্নে তিনি দেখলেন নদীর ধরে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান,একজন বয়স্ক মানুষ বসে চা খাচ্ছে।তিনি লোকটার চেহারা ঠাহর করে উঠতে পারলেন না,ধড়মড় করে জেগে উঠে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলেন।দৃশ্যটা এতটাই জীবন্ত যে কিছুক্ষণের জন্যে অজয়বাবু বুঝেই উঠতে পারলেন না যে তিনি সেটা দেখেছেন স্বপ্নে,বাস্তবে নয়।স্বপ্ন দেখা আজগুবি কিছু নয়,জেগে থাকলেও মানুষের মনে কত খেয়ালই তো আসে।অজয়বাবুর সমস্যা অন্য জায়গায়।প্রতিটি দৃশ্য যেন তাকে নিজের দিকে টানছে,প্রতিবার কোনো দৃশ্য চোখের পর্দায় ভেসে ওঠার পর তার মনে হয়,এই জায়গায় তিনি আগে গেছেন।এই ধান জমি,নদী,চায়ের দোকান,আমবাগান,তিনি আগেও দেখেছেন।সত্যি সত্যি,সামনাসামনি।
অজয়বাবুর ভ্রমণপিপাসা নেই।তিনি কদাচিৎ জবলপুরের বাইরে কোথাও যান।অনেক ভেবে,তিনি নিশ্চিত হযেছেন,এই দৃশ্যগুলির সঙ্গে তার পরিচিতির একমাত্র কারণ,এগুলো তার ছেলেবেলার গ্রামের দৃশ্য।মনের কোনে কোথাও বাসা বেঁধে ছিল।যতবার এই স্মৃতির ঝলক তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে,তিনি আরো বেশি অস্থির হয়ে ওঠেন।প্রতিবার সেই অসস্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ।তিনি এক অজানা টান অনুভব করছেন,ওই গ্রামটায় ফিরে যাওয়ার জন্যে।ওই জায়গাগুলো তার চেনা,তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে রোজ।জবলপুরে তার ভালো লাগছে না,কাজে মনোযোগ নেই।তিনি মনস্থির করে উঠতে পারছেন না কিছুই,এ কোন রোগে ধরল তাকে?তার গ্রামের নাম পর্যন্ত তার মনে নেই,পুরনো কাগজপত্র চিঠি উল্টে দেখেছেন তিনি এই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রোজ,যদি কথাও পাওয়া যায় নামটা!সেই গ্রামে তাকে ফিরে যেতেই হবে,অন্তত একবারের জন্যে ফিরে না গেলে তার মনে শান্তি হবে না।তাকে ফিরতেই হবে।গ্রামের নামটা কি মনে পড়বে না কিছুতেই?
২)
রাত বারোটা।অজয়বাবু ধড়মড় করে উঠে বসলেন বিছানায়,চোখে মুখে উত্তেজনা।মনে পড়ে গেছে,অবশেষে গ্রামের নামটা মনে পড়ে গেছে।সুরুচিপুর।সুরুচিপুর। পরদিনই অজয়বাবু অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে নিয়েছেন তিনি,কী করে সুরুচিপুর যেতে হয়?তিনি এমনিতে কোনকালেই ঘোরাফেরা করেননি,ইচ্ছেও করেনি কোনদিন।কিন্তু আজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে তার বেশ উত্তেজনা হচ্ছে,ভয়ও করছে।খেয়ালবশত বেরিয়ে পড়েছেন?ভুল করলেন না তো?যদি তার দেখা দৃশ্যগুলো সুরুচিপুরের না হয়?তাহলে?তাকে ট্রেনে করে কলকাতায় যেতে হবে।সেখান থেকে গাড়ি বদল করে বাকি রাস্তাটুকু যেতে হবে বাসে আর রিক্সায়।
৩)
সুরুচিপুর।বাস থেকে নেমেই অজয়বাবু বুঝতে পারলেন,এত আনন্দ তিনি জীবনে অনুভব করেননি।এই তো সেই জায়গা!এই তো তার ছোটবেলার খেলার মাঠ যা তাকে হাতছানি দিত স্বপ্নে!!সব কিছুই তার চেনা মনে হচ্ছে।সেই নদী,সেই বাগান,ধানক্ষেত,গাছপালা,আকাশ..এমনকী এখানকার বাতাসেও যেন উচ্ছাসের গন্ধ আছে।ভ্যান রিক্সাতে তে যেতে যেতে তিনি দু চোখ ভরে দেখতে লাগলেন চারিধারের দৃশ্য।তিনি অভিভূত।এই গ্রামে তার শৈশব কেটেছে!এত খোলামেলা,এত সবুজ,এত সুন্দরের মাঝে?আর আজকাল কিনা তিনি থাকেন জবলপুরের বন্ধ করা পরিবেশে,ইট সিমেন্টের জঙ্গলের মধ্যে একটা বন্ধ কামরাতে।এত বছর সেখানেই কেটে গেল।চোখে পড়ল না কোনো গাছপালা,নদী,পাখি....এমনকী কত বছর তিনি দু চোখ ভরে আকাশও দেখেননি।অজয়বাবুর মন স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠেছে।তিনি অন্তর থেকে অনুভব করলেন পাখিদের কলকাকলি,গরুদের গলার ঘন্টা,নদীর কুলকুল শব্দ।কী অপূর্ব জায়গা!জীবন কী শান্ত,কী উদার এখানে।আরে,ওই তো সেই দুটো ছেলে,গল্প করতে করতে যাচ্ছে আলপথ দিয়ে।বহুবছর আগে হয়ত আমিও ঐখান দিয়ে দৌড়ে গেছিলাম,অজয়বাবু ভাবলেন।দেখতে পেলেন স্বপ্নে দেখা বটগাছের তলায় বাঁধানো চাতাল,মাছ ধরার কোলাহল,হাঁসেদের প্যাঁকপ্যাঁকানি।তিনি আবিষ্কার করলেন নদীর ধারের সেই চায়ের দোকান,সূর্য অস্ত যাচ্ছে,চা খেতে খেতে সেই শোভা অনুভব করলেন সেই দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসে।অজয়বাবু একসময় স্বগোতক্তি করলেন,"ভাই অজয়,আজ তোমার পুনর্জন্ম হলো।বছরে তিন চার বার অন্তত এখানে আসতেই হবে,একটা ছোট বাড়ি কিনতে হবে এখানেই।এই নদী,এই আকাশ,এই গ্রাম আর এই গরম চা,আর আমি কিছুই চাই না।"
৪)
অজয়বাবু জবলপুরে ফিরে এসেছেন।কিন্তু তাঁর মনে সুরুচিপুরের রেশ রয়ে গেছে।আজকাল তাঁর দিনগুলি অনেক বদলে গেছে।তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকেন,মাখেমধ্যেই নর্মদার ধারে বা অন্য কথাও কাছাকাছি গিয়ে বেরিয়ে আসেন।মন মেজাজ ফুরফুরে,ভেবে রেখেছেন শীঘ্রই আবার ফিরে যাবেন নিজের গ্রামে বেশ কিছুদিনের ছুটি নিয়ে।অবসর পেলেই চিন্তা করেন সুরুচিপুরে দেখা ধানক্ষেত,মানুষজন,নদী আর আকাশের কথা।হঠাৎ করে ঝিলিক দেওয়া দৃশ্যগুলো তিনি আর আজকাল দেখতে পান না,কিন্তু তাঁর জীবনে ছাপ রয়ে গেছে সেই স্মৃতিদৃশ্যের।লোকে অজয়বাবুর জীবনযাপনের আর স্বভাবের এই বদল স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করেছে।তিনি আজকাল মাঝে মধ্যে সিনেমা দেখতে আর গান শুনতে যাচ্ছেন,ঘুরে বেড়াচ্ছেন হাসিমুখে,গুনগুনিয়ে গান করছেন এমনকি মিশুকে আড্ডা দিচ্ছেন।সকলেই ভাবে,অজয়বাবুর হলো কী?
রবিবার সকালে অজয়বাবু নিবিষ্ট মনে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছেন,বই পড়া তাঁর নতুন শখগুলোর মধ্যে একটা।এমন সময় দরজার ডোরবেলটা বেজে ওঠে।অজয়বাবু উঠে দরজা খোলেন।তাঁরই নামে চিঠি।চিঠিটা এসেছে হিজলতলা বলে একটি গ্রামের সরকারী দপ্তর থেকে।চিঠির বক্তব্য এইরূপ,"হিজলতলা মহকুমা দপ্তর থেকে আপনাকে জানানো হচ্ছে যে এই গ্রামে অবস্থিত থাকা আপনার পিতার মালিকানা জমি নিতে সরকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে।যেহেতু আপনার পিতা অথবা আপনার কোনো রকম ঠিকানা এতদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি,কোনরকম সংবাদ দেওয়াও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।অনেক চেষ্টার পর আপনার ঠিকানা পাওয়ায় আপনাকে এই চিঠি দেওয়া হচ্ছে।যদি আপনি আপনার পিতার মালিকানা জমি বিক্রয় করতে রাজি থাকেন,যথাশীঘ্র যোগাযোগ করুন।আপনার মত থাকিলে সেই জমিতে সরকার একটা স্কুল খুলিতে চায়।শৈশবে কাটানো আপনার গ্রামের বালক-বালিকাদের মঙ্গলের জন্যে আপনি সম্মত হবেন বলে আশা করি।--হিজলতলা মহকুমা দপ্তর" ।
চিঠির বক্তব্য পড়ে অজয়বাবু হতভম্ব হয়ে গেলেন।এই সবের মানে কী?হিজলতলা,এই নাম তো তিনি কোনওদিন শোনেননি।তাঁর শৈশবের গ্রাম তো সুরুচিপুর।তিনি সেখানে গেছেন,সব কিছুই তাঁর চেনা।হিজলতলা বলে কোনো জায়গার কথা তো তিনি জানেন না,তিনি সেখানে ছিলেনই বা কবে?কিন্তু তাহলে ওই চিঠি...সরকারী মহল থেকে কি না জেনেশুনে চিঠি দেওয়া হয?একটা কথা তাঁর ভালোভাবে জানা আছে,তাঁর বাবা একটি মাত্র গ্রামেই ছিলেন,কলকাতা চলে আসার পর কোনদিন সেখানে ফেরা হয়নি,অন্য কোনো গ্রামে গিয়ে জমি কেনারও মানে হয় না।কিন্তু তাদের বাসস্থান যদি হিজলতলাই হয়,তাহলে তিনি সুরুচিপুরের স্বপ্ন দেখবেন কেন?ভাবতে ভাবতে অজায়বাবুর মাথা গরম হয়ে গেল।তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।ভেবেচিন্তে তিনি ঠিক করলেন যে,তিনি চিঠি লিখে জানাবেন যে হিজলতলা বলে কোনো গ্রামে তিনি কোনদিন ছিলেন না।তারপর কী হয় দেখা যাক।
৫)
চিঠির উত্তর এসেছে হিজলতলা থেকে।সরকারের পক্ষ থেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ সহ তাকে জানানো হযেছে যে তিনি বাল্যকালে হিজলতলাতেই ছিলেন।তাদের পরিবারের নথিপত্র এবং জমির কাগজেও তাদের নামের উল্লেখ আছে।পুরনো বাসিন্দারা তাকে আর তাঁর বাবাকে চেনেন,এবং তাদের একজনের কাছ থেকে অজয়বাবুর বাবার লেখা কয়েক বছর আগেকার একটা চিঠির সূত্র ধরেই তাঁর এখনকার ঠিকানা পাওয়া গেছে।অতএব অজয়বাবু যে ছোটবেলায় হিজলতলাতেই ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। অজায়বাবুর অবস্থা অকহতব্য।সরকারী প্রমাণ তিনি অস্বীকার করবেন কী করে?আর তাঁর নিজের তো এতদিন কিছুই মনে ছিল না তাঁর গ্রামের কথা।কিন্তু এই যদি সত্যি হয়,এই সবের মাঝে সুরুচিপুর এলো কোত্থেকে?কী করে সেই সব দৃশ্যের স্মৃতি দেখলেন বার বার যা হুবহু সুরুচিপুর গিয়ে দেখেছেন তিনি?পুরনো কথা হঠাৎ মনে পড়লেও তো হিজলতলার কথায় মনে পড়া উচিত ছিল।তাঁর কি কোনো মানসিক অসুখ করেছে?অজয়বাবুর চিন্তা ক্রমে বাড়ছে,কোনরকম পথ পাচ্ছেন না শান্ত হওয়ার।মনের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে সেই সব ছবি,যা দেখে তিনি সুরুচিপুরকে নিজের গ্রাম বলে ভেবে নিয়েছিলেন।হঠাৎ অজয়বাবুর মনে পড়ল প্রদীপের কথা।তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট,কিন্তু নানা বিষয়ে জ্ঞান আছে।তার সঙ্গে আগে কয়েকবার কথা বলে ভালো লেগেছিল অজয়বাবুর।একবার যদি প্রদীপের সঙ্গে আলোচনা করা যেত,যদি কোন উত্তর পাওয়া যায়?অন্তত তাকে বললে সে যে ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেবে না,সেই বিশ্বাস আছে অজয়বাবুর।আর তাতেই যদি মনটা হালকা হয়?
৬)
প্রদীপের বাড়ির বসার ঘর বেশ সুন্দর করে সাজানো।ঘরের একদিকে বই এর তাক,টবে কিছু গাছ।প্রদীপ মন দিয়ে চিঠি পড়ছে।অজয়বাবু উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করছিলেন একদিকের সোফায় বসে।"আচ্ছা বলুন তো অজয়দা,সুরুচিপুর নামটা আপনার মাথায় এলো কি করে?এত বছর ধরে তো আপনার মনেই ছিল না আপনার গ্রামের নাম?"প্রদীপ অজয়বাবুকে প্রশ্ন করে হঠাৎ।প্রথমে অজয়বাবু উত্তর দিতে পারলেন না।সত্যি,এত বছর যখন নামটা মাথায় আসেনি,নামটা যেন হুট করে মাথায় উড়ে এলো একদিন।তিনি উত্তর দিলেন,"আসলে আমি,আসলে ওই দৃশ্যগুলো দেখার পর আমি ওখানে যাওয়ার জন্যে,চেষ্টা করছিলাম যাতে নামটা মনে পড়ে যায়,মানে মাথায় হয় নামটা ছিলই।এত বছরে বোধহয় ভুলে গেছিলাম এই ভেবে,একদিন পুরনো জিনিসপত্র,চিঠিপত্র খুঁজে দেখছিলাম যদি কোথাও নামটা লেখা থাকে..সেখানেই কি নামটা পেয়েছিলাম...হ্যাঁ,তাই হবে..অজয়বাবু নিজেকেই উত্তর দেন .."হুম"প্রদীপ উত্তর দেয়,"কখনো কখনো কোনো জায়গার নাম,আর ছবি আমাদের অবচেতনে রয়ে যায় অজয়দা,গুগল থেকে,টেলিভিশন থেকে,সে যাই হোক,একটা কথা পরিষ্কার,আপনার ছোটবেলার গ্রাম হিজলতলা,সুরুচিপুর নয়।"
"কিন্তু আমি তাহলে বার বার সুরুচিপুরের স্মৃতি দেখতে পেলাম কি করে?আমি তো সেখানে যাইনি কোনদিন", অজয়বাবু উৎকন্ঠিত হয়ে জানতে চাইলেন।প্রদীপ তাকে প্রশ্ন করল,"আচ্ছা আপনি কি করে বুঝতে পারলেন যা দেখেছেন,সেইগুলো আপনার শৈশবের স্মৃতি?আপনি কি আপনাকে অথবা আপনার মা বাবাকে দেখেছিলেন ছবিগুলোতে?"
অজয়বাবু বললেন,"না,সেরকম দেখিনি।কিন্তু আমার সব কিছু আরো চেনা মনে হত পরিবার ছবিগুলি ঝিলিক দেওয়ার পর।একটা যোগাযোগ অনুভব করতাম প্রচন্ড ভাবে।"
প্রদীপ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অজয়বাবুর দিকে,কিছুক্ষণ পর বলে," বুঝেছি অজয়দা,উত্তরটা আমি পেয়েছি।"
অজয়বাবু অস্থির হয়ে বলে ওঠেন,"কি বুঝেছ?"
প্রদীপ শান্ত স্বরে বলে,"যেই দৃশ্যগুলো আপনি দেখেছেন এতদিন ধরে স্বপ্নে অথবা জেগে,সেগুলে আসলে অতীতের নয়,ভবিষ্যতের।"
"তার মানে?"অজয়বাবু হতভম্ব।
স্বপ্নস্মৃতি
প্রদীপ বলল,"অজয়দা,আমরা প্রতিদিন স্বপ্নে যা দেখি,তাঁর পুরোটাই কল্পনা নয়।আমরা অতীত বা ভবিষ্যত এরও কিছু দৃশ্য দেখতে পাই।অনেক সময় দেখা যায়,একটা বিশেষ সময় বা মুহুর্তে আপনার মনে হয়,আরে,এই মুহূর্তটা তো আমি আগে দেখেছি,কাটিয়েছি আগেও।মনে করুন,আপনি আমার বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছেন,দেয়াল ঘড়িতে দশটা বাজলো,অমনি আপনার মনে হলো,আরে এই মুহুর্তটা তো আমি আগেও কাটিয়েছি।এরকম দেখার জন্যে বিশেষ কোনো শক্তির দরকার হয় না,সাধারণ মানুষ মাত্রেই এরম হয়।"
অজয়বাবু মন দিয়ে শুনছিলেন।বললেন,"কিন্তু এগুলো তো ডেজাভু,তুমি বলতে চাও আমার ব্যাপারটাও ডেজাভু।"
প্রদীপ একটু হেসে বলল,"না।এই অনুভূতিকে বলে প্রিকগনিশান।আপনার ব্যাপারটা ডেজাভু নয় কেননা ডেজাভু র আক্ষরিক অর্থ যা আপনি আগেই দেখেছেন।মানুষের মনে একটা ধারণা জন্মায় যে সে এই ঘটনাটা আগে দেখেছে,এখন সেটা ঘটে থাকতে পারে অথবা নাও পারে,মোট কথা ডেজাভু মানে অতীত।স্বপ্ন অনেক রকম হয়।কখনো সেটা অতীতের প্রতিচ্ছবি,কখনো ভবিষ্যতের আয়না।আপনার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টা ঠিক।
অজয়বাবু অধৈর্য হয়ে বললেন,"কি বলছ বল তো?এরকম হয়?যেটা দেখিনি সেটা দিয়ে স্বপ্ন?এটা কি সম্ভব?
প্রদীপ উত্তর দিল,"সম্ভব অজয়দা,সম্ভব।আমাদের মস্তিস্ক অদ্ভুত জিনিষ।কোটি কোটি স্নায়ুতে ঠাসা আমাদের মস্তিস্ক বৈদ্যুতিক স্পন্দন তৈরী করে অতীত,বর্তমান আর ভবিষ্যত সব দেখাতে পারে।আপনার মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক,কিন্তু মনে করে দেখুন,আপনি সুরুচিপুরে গিয়ে যা দেখেছেন,আর যা আগে স্বপ্নে দেখেছিলেন সব একদম এক রকম...ঠিক কি না?
অজয়বাবু উত্তর দিতে পারলেন না।কথাটায় কোনো ভুল নেই।আগে এরকম করে ভেবে দেখেননি।
তিনি একসময় ভেবে বললেন,"কিন্তু একটা জিনিষ আমি দেখতে পাইনি।একজন লোক নদীর ধরে বসে চা খাচ্ছিল,তাকে দেখিনি"।
প্রদীপ হেসে বলল,"ওটা আপনি নিজেকেই দেখেছেন,আপনি তো চা খেয়েছিলেন সেখানে,না কি?"
অজয়বাবু অস্বীকার করতে পারলেন না।
প্রদীপ আরো বলল,"এককথায় বলতে গেলে অজয়দা,আপনার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে সেটা প্রিকগনিশান.বাংলায় এই কথাগুলোর ঠিক ঠিক প্রতিশব্দ নেই..মানে আপনি যা দেখলেন স্বপ্নে,অথবা জেগে,আপনার জীবনে হয়নি,কিন্তু হবে,অন্যরকম ভাবে হতে পারে,কিন্তু হবেই..না,আপনি বিশেষ ক্ষমতাঁর অধিকারী নন,যদি হতেন তাহলে একটা বিশেষ ঘটনা মাত্র দেখতেন না।এর সবকিছুর ব্যাখা আছে যদিও,সময়ের কম্পাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী যদি একটা বেড়াল তার সমস্ত জীবন একটা বন্ধ সিন্দুকে কাটায় সেই সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে আমরা এক মুহুর্তে একসঙ্গে তাঁর জন্ম,জীবন ও মৃত্য দেখতে পারি,মানুষের মস্তিস্কের এতটাই ক্ষমতা। এমনিতে আমরা মানুষের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতায় থাকি বলে কিছু এই ক্ষমতা বুঝতে পারি না,কিন্তু স্বপ্নে এই সীমানা থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসতে পারি,তাই অবচেতনে ভবিষ্যত দেখতে বাধা থাকে না..
অজয়বাবু তাকে থামিয়ে বলল,"কিন্তু আমার মত সকলের সঙ্গেই কি এরকম হয়,মানে..."
প্রদীপ এগিয়ে এসে অজয়বাবুর কাঁধে হাত রেখে বলল,"না অজয়দা,আপনার ক্ষেত্রে যেটা হযেছে সেটা চমকপ্রদ।একটা বিশেষ জায়গা আপনাকে আদর করে টেনে এনেছে,আপনাকে দেখিয়েছে তার সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতা,বারবার...কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যান সুরুচিপুর আপনার ছোটবেলার না!শুধু বলুন ..সেখানে গিয়ে আপনার কেমন লাগলো...কী মনে হল?কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যান সুরুচিপুর আপনার ছোটবেলার গ্রাম কি না!শুধু বলুন ..সেখানে গিয়ে আপনার কেমন লাগল...কী মনে হল?"
অজয়বাবু উদাস চোখে প্রদীপের দিকে তাকালেন।
প্রদীপ তাকে বলল,"আপনাকে উত্তর দিতে জোর করব না অজয়দা।আপনিও জানেন আর আমিও জানি সুরুচিপুর আপনাকে কিভাবে আর কতটা বদলেছে?আপনি এখন জানেন আপনি কী হারাচ্ছিলেন?কী আসে যায় সুরুচিপুর আপনার নিজের গ্রাম কি না..."
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অজয়বাবু বললেন,"সব বুঝলাম।কিন্তু এবার আমি কী করব?ভুলে যাব সেই জায়গাটাকে যেখানে গিয়ে ভেবেছিলাম এই আমার শিকড়,আমার গ্রাম।সেই আকাশ,নদী,সবুজ...ভুলে যাব সব?"
প্রদীপ ধীর স্বরে বলল,"আপনাকে কিছুই ভুলতে হবে না অজয়দা।আপনার জীবনের এই অভিজ্ঞতাকে কে আপনি ভগবানের আশীর্বাদ মনে করুন।এর আগে আপনি জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছিলেন খালি,কিছুই উপভোগ করতেন না।এই অভিজ্ঞতাটা আপনাকে বুঝিয়েছে আমাদের এই পৃথিবীটা কত সুন্দর..যদি নাই দেখেন দু চোখ ভরে এই আকাশ,জঙ্গল,নদী,কথা না বলেন মানুষের সাথে,যদি এই সুন্দর পৃথিবীর সঙ্গে বাঁধন অনুভব না করেন,কোনো কিছুর জন্যে উৎসাহ না প্রকাশ করেন তাহলে বেঁচে থেকে কী লাভ?আপনি এখন আনন্দে আছেন,ফিরে যেতে চাইছেন সুরুচিপুরের নদীর ধরে,এই চাওয়াপাওয়াটাই তো জীবন।বোধহয় সুরুচিপুরের সঙ্গে পূর্বজন্ম অথবা পরের জন্মের কোন যোগাযোগ আছে আপনার ?আমরা আর কতটুকু জানি?আজ থেকে মনে করুন,সুরুচিপুরই আপনার গ্রাম,দেশ।সুখী হবেন।"
অজয়বাবু ইতস্তত করে বললেন,"কিন্তু হিজলতলার জমির ব্যাপারটা..."
প্রদীপ বলল,"বিক্রি করে দিন।ভালই তো হবে।ওখানে ছোটদের স্কুল হবে।ছোট ছেলেমেয়েরা শিখবে জীবনের পথ।আপনাকে ভগবান যা দিয়েছেন সুরুচিপুর দিয়ে,তাঁর বদলে এইটুকু না হয় ফেরৎ দিলেন নিজের মত করে"।
অজয়বাবুর মুখ প্রশান্তিতে ভরে গেল।

ছবিঃ নভোনীল দে

Friday, January 16, 2015

সাত মাসে ‘সুদিন’ এসেছে শুধু ধনীদের: কারাত [সৌজন্যেঃ- সম​য়ের সাথে]

জলন্ধর, ১৫ই জানুয়ারি- গত সাত মাসে বোঝা গেছে নরেন্দ্র মোদীর ‘সুদিনের’ স্লোগানের প্রকৃত অর্থ কী। আদানি গোষ্ঠীর সম্পদ বেড়েছে ২৫হাজার কোটি টাকা। শ্রমজীবী মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন সমস্ত দিক থেকে। সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত এই কথা বলেছেন। সি পি আই (এম) পাঞ্জাব রাজ্য সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে কারাত এই কথা বলেন। জলন্ধরের কাছে জান্ডিয়ালা মাঞ্জকিতে বৃহস্পতিবার প্রকাশ্য সমাবেশের মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছে সম্মেলন। 


কারাত বলেন, বি জে পি সরকারের নীতি প্রকটভাবে কর্পোরেট ও ধনীদের স্বার্থরক্ষা করছে। বেসরকারী ক্ষেত্রের হাতে দেশের সম্পদ তুলে দেওয়া হচ্ছে। বিদেশী পুঁজির লুটের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রকে। নির্বাচনের আগে ‘সুদিন’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী। অনেকের জন্য সেই সুদিন এসে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি আদানির সম্পদ সাত মাসে বেড়েছে ২৫হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, গরিব মানুষের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্প ছাঁটাই করা হচ্ছে। 

কারাত বলেন, বি জে পি-র এই কয়েকমাসের শাসনেই ন’টি অর্ডিন্যান্স জারি হয়েছে। বীমাক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ, শ্রম আইন সংশোধন, জমি অধিগ্রহণ আইন সংশোধন, কয়লাক্ষেত্র খুলে দেওয়া, খনিক্ষেত্র খুলে দেওয়ার জন্য অর্ডিন্যান্স হচ্ছে। সরকার সংসদকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। লোকসভায় বি জে পি-র নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও সংসদকে এড়িয়ে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করতে চাইছে বি জে পি। 

কারাত বলেন, বি জে পি চলছে আর এস এস-র নির্দেশে। আর এস এস হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতির ভারতকে নষ্ট করতে চাইছে আর এস এস। দেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটিয়ে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য ধ্বংস করতে চায় তারা। একদিকে ধনীদের মুনাফা বৃদ্ধির নীতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ঐক্য ভাঙার চেষ্টা দেশের সামনে গুরুতর বিপদ উপস্থিত করেছে। 

কারাত বলেন, এই উভয় বিপদের বিরুদ্ধে বড় লড়াইবের জন্য সি পি আই (এম) প্রস্তুত হচ্ছে। এই লড়াইয়ে বামপন্থী শক্তিসমূহের ঐক্য প্রয়োজন। বামপন্থীদের মধ্যে ঐক্য গঠনের চেষ্টাও জারি রয়েছে। বামপন্থীরাই দেশের এই বিপদ প্রতিহত করতে সক্ষম।
- See more at: http://ganashakti.com/bengali/news_details.php?newsid=64034#sthash.AhsWztSt.dpuf

Tuesday, December 30, 2014

জ্যোতি বসু.... শতবর্ষে শ্রদ্ধা [সৌজন্যেঃ- সম​য়ের সাথে]



অবাধেই জমি অধিগ্রহণ করতে ফের অর্ডিন্যান্স করলো কেন্দ্র

সৌজন্যে:- সময়ের সাথে (নয়াদিল্লি, ২৯শে ডিসেম্বর)-

এ বছরের জানুয়ারি মাসে আইন হয়েছিল। কার্যত তার অর্ধেকই বাতিল হয়ে গেল বছর না ঘুরতেই। 

বহু টানাপড়েনের পরে ইউ পি এ সরকারের শেষ প্রান্তে চালু হওয়া জমি অধিগ্রহণ আইনের বহু ধারা বাতিল করে সংশোধনী অর্ডিন্যান্স আনলো নরেন্দ্র মোদী সরকার। সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এই অর্ডিন্যান্স অনুমোদন করেছে। নতুন অর্ডিন্যান্সের ফলে জমি অধিগ্রহণ করতে ‘সম্মতি’, গণশুনানি, সামাজিক প্রভাব সমীক্ষার আর কার্যত কোনো প্রয়োজন হবে না। চালু আইনে শিল্প তৈরির অসুবিধা হচ্ছে কারণ দেখিয়ে এমনকি বহুফসলী জমিকেও অবাধে অধিগ্রহণের রাস্তা ফের খুলে দেওয়া হলো। তা করা হলো সংসদের শীত অধিবেশন শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। অর্থনৈতিক সংস্কারের বেশ কিছু কর্মসূচীতে সংসদের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই একের পর এক অর্ডিন্যান্সের পথে যাচ্ছে মোদী সরকার। বীমায় বিদেশী বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে দেওয়া, কয়লা ক্ষেত্রে কার্যত বেসরকারীকরণের লক্ষ্যেও উপর্যুপরি অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছে। এবার বহুচর্চিত জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত আইনও বদলে দেওয়া হলো সংসদে বিন্দুমাত্র আলোচনা ছাড়াই। এরপরে খনি ক্ষেত্রে বেসরকারী ও বিদেশী পুঁজিকে আরো অনুপ্রবেশের সুযোগ দিতে অধ্যাদেশ জারির প্রস্তুতি চলছে। 


বেশ কয়েক বছর ধরে জমি অধিগ্রহণ ঘিরে দেশের নানা প্রান্তেই বিক্ষোভ-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকায় স্বাধীনতার পর থেকে চালু এ সংক্রান্ত আইন পরিবর্তনের দাবি ওঠে। অভিযোগ উঠেছিল, কৃষকদের জমি চলে যাচ্ছে কর্পোরেট ক্ষেত্রের কাছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামে বিপুল পরিমাণ জমি দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর হাতে। বেসরকারী শিল্পক্ষেত্রের জন্যও জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে নির্বিচারে। অনেক ক্ষেত্রেই জমিহারাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, জমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকার পুনর্বাসন ছাড়াই এই প্রক্রিয়া চলছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে জমি অধিগ্রহণ আইনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ইউ পি এ সরকারের আমলেই। সেই আইনের খসড়া নিয়ে কালক্ষেপ হয়, বারংবার আলোচনা হয় সরকারী স্তরে এ সংসদীয় কমিটিতে। অবশেষে ২০১৩সালে নতুন আইন অনুমোদন হয় এবং এ বছরের জানুয়ারি মাসে অস্তগামী ইউ পি এ সরকারের আমলেই তা চালু হয়। 

সোমবার সেই আইনের গুরুতর পরিবর্তন করে নতুন অর্ডিন্যান্স করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি দাবি করেছেন, ক্ষতিপূরণের কোনো পরিবর্তন করা হচ্ছে না। কিন্তু ‘পাঁচটি ক্ষেত্রে’ জমি অধিগ্রহণের সময়ে ‘জমির মালিকদের সম্মতি’ নেবার ধারা তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই পাঁচটি ক্ষেত্র হলো: জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ সহ গ্রামীণ পরিকাঠামো, শিল্প করিডর, সামাজিক পরিকাঠামো যেখানে জমির মালিকানা সরকারেরই থাকবে। এই পাঁচ ক্ষেত্রে মধ্যে শুধু সরকারী উদ্যোগই নয়, সরকারী-বেসরকারী যৌথ উদ্যোগ বা পি পি পি-ও থাকবে। জেটলির ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ ( বেসরকারী বিদ্যুৎ উৎপাদনও), আবাসন নির্মাণ, রাস্তা এবং শিল্প করিডরের নামে বেসরকারী শিল্প প্রকল্পের গুচ্ছের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার ক্ষেত্রে বর্তমান আইনে চালু ‘৭০শতাংশ জমির মালিকের সম্মতি’ লাগবে না। কোনো সম্মতির শর্তই আর কার্যকর হবে না। চালু আইনে ছিলো, কোনো জমি অধিগ্রহণের আগে সামাজিক প্রভাবের সমীক্ষা করতে হবে। অর্থমন্ত্রী তা-ও বাতিল করে দিয়েছেন, ‘উন্নয়নের কাজে ব্যাঘাত’ বলে। দ্রুত প্রকল্প করার জন্য জমি নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধাই যে কেন্দ্র আর মানবে না, তার ইঙ্গিত দিয়ে জেটলি বলেন, জমি নেবার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রিতার জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আটকে আছে। এই জটিলতা কাটাতেই এই সংশোধনী। 

একই সঙ্গে, চালু আইনে ১৩টি এমন ক্ষেত্র আইনের পরিধির বাইরে ছিলো যার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি জমি নেওয়া হয়। যেমন কয়লা ক্ষেত্রের এলাকা, খনি, জাতীয় সড়ক ইত্যাদি সংক্রান্ত আইন। নতুন সংশোধনীতে এই ক্ষেত্রগুলিকেও জমি অধিগ্রহণের মূল আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এইসব আইনের আওতায় অধিগৃহীত জমির মালিকরাও এবার থেকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পাবেন বলে জেটলি দাবি করেছেন। উল্লেখ্য জমি অধিগ্রহণ আইন চালুর সময়ে সি পি আই (এম) এই ১৩টি পৃথক আইনকেও মূল আইনের অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি সংসদে পেশ করেছিল। 

সোমবার এই অর্ডিন্যান্স অনুমোদনের পরে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের এত তাড়াহুড়ো কেন? সংসদের অধিবেশন পর্যন্ত সরকার অপেক্ষা করলো না কেন? কেন একের পর এক অর্ডিন্যান্স জারি করে সরকার এগোচ্ছে? জেটলির সদম্ভ উত্তর, সরকারকে দৃঢ়তা নিয়েই নিজের সিদ্ধান্ত রূপায়ণ করতে হবে। সংস্কারের পথে সংসদ বা রাজনৈতিক ‘বাধা’ মান্য করা হবে না বলে আগেই জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর অর্থমন্ত্রী। সেই সূত্রই বাস্তবায়িত হচ্ছে। 

তবে, জমি অধিগ্রহণ আইনের এই পরিবর্তনের দায় রাজ্যগুলির ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সরকারী বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, রাজ্য সরকারগুলির মতামত, রাজ্যের রাজস্ব মন্ত্রীদের বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকগুলির সঙ্গে আলোচনায় প্রকল্প রূপায়ণের পথে বাধার কথা এসেছিল। তাই এই পথেই যাওয়া হচ্ছে। বস্তুত কয়েকদিন আগেই রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে আলোচনার অনুবর্তী হিসাবে একটি সরকারী ‘মিনিটস’ তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ১৯টি সংশোধনীর প্রস্তাব ছিলো। কিন্তু রাজ্য সরকারগুলির পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এড়িয়েই শুধুমাত্র কেন্দ্রের চিন্তার সঙ্গে খাপ খায় এমন প্রস্তাবগুলিই বেছে নেওয়া হয়েছিল।

Sunday, August 25, 2013

Kobita

কথোপকথন -৪
------পুর্ণেন্দু পত্রী

- যে কোন একটা ফুলের নাম বল
- দুঃখ ।
- যে কোন একটা নদীর নাম বল
- বেদনা ।
- যে কোন একটা গাছের নাম বল
- দীর্ঘশ্বাস ।
- যে কোন একটা নক্ষত্রের নাম বল
- অশ্রু ।
- এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি ।
- বলো ।
- খুব সুখী হবে জীবনে ।
শ্বেত পাথরে পা ।
সোনার পালঙ্কে গা ।
এগুতে সাতমহল
পিছোতে সাতমহল ।
ঝর্ণার জলে স্নান
ফোয়ারার জলে কুলকুচি ।
তুমি বলবে, সাজবো ।
বাগানে মালিণীরা গাঁথবে মালা
ঘরে দাসিরা বাটবে চন্দন ।
তুমি বলবে, ঘুমবো ।
অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,
অমনি জোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী ।
সুখের নাগর দোলায় এইভাবে অনেকদিন ।
তারপর
বুকের ডান পাঁজরে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে
রক্তের রাঙ্গা মাটির পথে সুড়ঙ্গ কেটে কেটে
একটা সাপ
পায়ে বালুচরীর নকশা
নদীর বুকে ঝুঁকে-পড়া লাল গোধূলি তার চোখ
বিয়েবাড়ির ব্যাকুল নহবত তার হাসি,
দাঁতে মুক্তোর দানার মত বিষ,
পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে তোমাকে
যেন বটের শিকড়
মাটিকে ভেদ করে যার আলিঙ্গন ।
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রং হলুদ
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত গয়নায় শ্যাওলা
ধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানা
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা ।
- সেই সাপটা বুঝি তুমি ?
- না ।
- তবে ?
- স্মৃতি ।
বাসর ঘরে ঢুকার সময় যাকে ফেলে এসেছিলে
পোড়া ধুপের পাশে ।

Monday, July 15, 2013

একার সঙ্গে মুখোমুখি হলো একা

প্রবন্ধ...           
৩০ আষাঢ় ১৪২০ সোমবার ১৫ জুলাই ২০১৩

‘একার সঙ্গে মুখোমুখি হলো একা’
ক’দিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে তাদের আবাসনে ঢুকছি, গেটের প্রহরী আমাকে দাঁড় করিয়ে নাম-ঠিকানা লিখতে বললেন। বন্ধুর ফ্ল্যাটে ঢুকতেই তার প্রশ্ন: ‘সিকিয়োরিটি গার্ড কোনও অসভ্যতা করেনি তো?’ বললাম, ‘অসভ্যতা কেন হবে, প্রহরী তাঁর ডিউটি করেছেন, আমাকে দাঁড় করিয়ে নাম-ঠিকানা লিখিয়ে নিলেন।’ এ বারে বন্ধুটির রসিকতা: ‘থিয়েটারের স্টার বলে চিনতে পারেনি, রণবীর কপূর হলে ছেড়ে দিত।’
একমত হতে পারলাম না। রণবীর কপূরকেও কড়া প্রহরায় হাত তুলে দাঁড়াতে হয়, ভারতে যদি নাও-বা হয়, আমেরিকার কোনও বিমানবন্দরে তো বটেই। আমরা প্রত্যেকে যে পেশারই হই-না-কেন, যত উঁচুতেই উঠি-না-কেন, আমাদের কোথাও-না-কোথাও হাত তুলে দাঁড়াতেই হয়। এ কথাটাই আমাদের খেয়াল থাকে না দৌড়তে দৌড়তে। ঘোড়ার পিঠে চেপেছি তো আমরা, হুঁশ থাকে না কোথায় থামতে হবে। ভুলে যাই যে, যদি না থামতে চাই, নিজেদেরই ছোট্ট অথচ মারাত্মক কোনও ত্রুটিতে এক সময়ে ঠিক থেমে যেতে হয়। তখন হাত তুলেই দাঁড়াতে হয়, মাথা নোয়াতে হয় কোনও ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রশক্তি, প্রতিষ্ঠান বা মিডিয়া-র রক্তচক্ষুর সামনে। নিজের কাছেই নিজেকে জবাবদিহি করতে হয়।
‘অলীক সুখ’-এর যে চরিত্রে আমি অভিনয় করেছি, তার ঠিক এমনই দশা! সে ডাক্তার, রীতিমত দায়িত্ববান, তার রোগীদের প্রতি, তার পরিবারেরও প্রতি। সে যেমন যত্ন করে রোগী দেখে, তেমনই যত্ন করে বাবা-মা-বউ-বাচ্চাকে। নিজের ডাক্তারির গুণেই সে ক্রমশ যশ-অর্থ পেতে শুরু করে। সেই পাওয়াটা বাড়তে-বাড়তে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, ক্ষণিকের জন্যে হলেও সে তার কর্তব্যের বোধ থেকে সরে যায়। ফলে অপরিমেয় ক্ষতি তার রোগীর তো হয়ই, সমপরিমাণ ক্ষতি তার নিজেরও হয়। নিজের কাছেও সে খুব ছোট হয়ে যায়। তার মাস্টারমশাই, তিনিও ডাক্তার, তাকে বলেন মানুষের শরীর যে যন্ত্র নয়, এটা তুমি ভুলে গেলে কী করে?
যে সব ডাক্তার দিনে প্রচুর অপারেশন আর একগাদা চেম্বার করেন, ক্রমাগত এক নার্সিংহোম থেকে অন্য নার্সিংহোমে ছুটে বেড়ান, এ-ছবিতে তাঁদের সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে এঁরা প্রত্যেক রোগীকে চার মিনিটের বেশি সময় দেন না, এঁরা রোগীর মন বুঝবেন না রোগ বুঝবেন?
কিন্তু এটা তো শুধু ডাক্তারি পেশার সমস্যা নয়, প্রতিটি পেশারই সমস্যা। এটা আদতে একটা মূল্যবোধের লড়াই কী ভাবে দেখব নিজের পেশাটাকে, নিজের জীবনটাকে? নিশ্চয়ই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করে যাব, সে কাজের বিনিময়ে যা প্রাপ্য তা নেব। কিন্তু আমার প্রচেষ্টা আর প্রাপ্য এ দু’য়েরই যে একটা পরিসীমা আছে, সেটাও পাশাপাশি মনে রাখব। যদি না রাখি তাহলে নাম আর বিত্তের পিছনে ছুটতে-ছুটতে এমন কোনও বড় ভুল করে বসব যা অসংশোধনীয়।
এ সমস্যা আমারও হয়, যখন সকালে একটা শো করে ফের বিকেলে আর একটা শো করি। হয়তো দুটোই আমার প্রিয় নাট্যদল, দুটোই আমার প্রিয় চরিত্র, অভিনয়ের দিক থেকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, এবং অভিনয়টা করেও আমি অসম্ভব একটা আনন্দ পাই, অনাবিল আনন্দ। কিন্তু ওই আনন্দ পাওয়ার মধ্যে কোনও বিপদ ঘনিয়ে ওঠে না তো? পাতা থাকে না তো কোনও ফাঁদ? শঙ্খ ঘোষের একটা কবিতায় আছে‘গভীর ঘুমের মধ্যে/ হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ এসে দাঁড়ায়/ তার আদরে আদরে ভরে যেতে থাকে আমার অপাবৃত শরীর।/ ক্ষতগুলি চেনা যায় জেগে উঠবার বহু পরে।’ এই যে একটা শো থেকে আর একটা শো, একটা অভিনয় থেকে আর একটা অভিনয়, ক্রমাগত দৌড়ে চলেছি ওই দৌড়টাই আসলে ‘গভীর ঘুম’, আর তার মধ্যেই ‘সর্বনাশ এসে দাঁড়ায়’। যে অ্যাচিভমেন্ট বা সাফল্যের জন্যে এই দৌড়, সেটাই ‘অলীক সুখ’। তারপর যখন সম্বিত ফেরে, তখন বুঝতে পারি ‘ক্ষতগুলি চেনা যায় জেগে উঠবার বহু পরে’।
অথচ এটাকে কাজ মনে করেই আমি দৌড়চ্ছিলাম, নিজেকে পুরোদস্তুর পেশাদার প্রমাণ করার জন্যেই। কিন্তু আমার এই কর্মসচেতনতার তলায় অচেতনে কোথাও অহংকার লুকিয়ে থাকে না কি? প্রশ্নটা প্রায়ই আমাকে কুরে-কুরে খায়। হয়তো প্রতিটি পেশার প্রতিটি এগিয়ে-থাকা মানুষকেই। অথচ প্রশ্নটাকে আমরা এড়িয়ে যেতে থাকি। আসলে প্রশ্নটাকে নয়, এড়াচ্ছি নিজের সঙ্গে নিজের মুখোমুখি হওয়াটাকে। আয়নার সামনে চুলের মুঠি ধরে নিজেকে টেনে আনতে আমরা যে ভয় পাই। নিজের ভিতরের মানুষটাকে পুরো দেখে ফেললে ভারী অস্বস্তি হয়, সব রকমের গোলমাল আর অকিঞ্চিৎকর ব্যাপারস্যাপারগুলো ধরা পড়ে যায়। এখানেও শঙ্খ ঘোষ এসে পড়েন, ‘একার সঙ্গে মুখোমুখি হলো একা।’ সত্যিই যদি একার সঙ্গে মুখোমুখি হতে পারতাম একা, বোঝাপড়া করতে পারতাম, হয়তো বেঁচে যেতাম সর্বনাশের হাত থেকে।
বেঁচে থাকার এই বোধটা প্রখর ছিল শিশিরকুমার ভাদুড়ির। যখন তিনি তুমুল জনপ্রিয়, সাফল্য-খ্যাতির তুঙ্গে, তখনও তিনি অনায়াসে রুস্তমজি ধোতিওয়ালা’র ম্যাডান কোম্পানির নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। আর বেরিয়ে আসার সময় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সীতা’য় রামের সংলাপ উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে: ‘এই অন্তঃসারশূন্য গৌরব/ এ পাপ, পরি শুধু পুণ্য ছদ্মবেশ’। মানুষটার সঙ্গে বসবাস করি তো এখন, ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’-এ শিশিরকুমারের চরিত্রটা আমাকে করতে হয়, ওঁর অভিনীত চরিত্রের সংলাপগুলো যেন নিজের সংলাপ বলে মনে হয়।
‘অলীক সুখ’-এর ডাক্তারের কথায় ফিরে আসি। সে তো আসলে সুখ চেয়েছিল, তার বাবা-মা-বউ-বাচ্চাকে সুখী করতে চেয়েছিল, বলেওছে তার স্ত্রীকে এ সব কার জন্যে করছি? তোমাদের সুখের জন্যেই তো! ‘আন্তিগোনে’ নাটকে আন্তিগোনেও ক্রেয়নকে জিজ্ঞেস করেছিল ‘সুখ কাকে বলে?’ ক্রেয়ন বলেছিল ‘যতটুকু সুখ তুমি জীবন থেকে আদায় করে নিতে পারো, ততটুকুই জীবন, তার বেশি কিছু নয়।’ ক্রেয়নের কথা মেনেই বোধহয় আমরা কিংবা ‘অলীক সুখ’-এর ডাক্তারটি সুখ আদায় করার জন্যে ছুটে চলেছি। যতটুকু সুখ ততটুকুই জীবন এমন এক অলীক তাড়নাই আমাদের ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে।
এ ভাবে নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়, জীবনে লব্ধপ্রতিষ্ঠ হতে হবে এমন উপদেশ শুনতে-শুনতেই তো বড় হই আমরা। তাছাড়া, সমাজে সম্মাননীয় হয়ে ওঠায় আপত্তিই-বা কোথায়? আমি-আপনি সকলেই তো চাই এমন অভীষ্ট বা লক্ষ্যে পৌঁছতে। শুধু পৌঁছনোর পথটা নিয়ে যেন একটু সতর্ক থাকি, মানবিক বোধগুলিকে যেন ছেঁটে না ফেলি...
না হলে অভীষ্ট পূরণের পর কোনও এক দিন যখন একা-একা কথা বলব নিজের সঙ্গে, ফের শঙ্খ ঘোষের কবিতা এসে বিব্রত করবে: ‘সম্মানের অপমানে তুমি কি গিয়েছ খুব ঝুঁকে?’

Sunday, June 23, 2013

তোমার চোখে সেদিন আমি ভালবাসা দেখে ছিলাম

তোমার চোখে সেদিন আমি ভালবাসা দেখে ছিলাম


তোমাকে হারাবার ভয় আমি আজো অনুভব করি
যেমনটা করে ছিলাম সেই সন্ধ্যে বেলায়
পিচ ঢালা পথের ধারে বসে ।
ছিলনা অর্কিড কিংবা হাস্নাহেনার মাতাল গন্ধ
 
তোমাকে মনে হয়েছিল সেই দিন
 
স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো
 
নিশ্চুপ অথচ সংকল্প বদ্ধ ।

তোমাকে হারাবার সেই দিনগুলো আজো মনে পড়ে
 
কাঠ পাথরের এই শহুরে জীবনের পরতে পরতে
 
হারাবার বেদনায় ম্রিয়মান, এই ধূসর আমি

আজ শেষ দিনগুলোর প্রান্তে এসে
 
তোমার চোখে সেদিন আমি ভালবাসা দেখে ছিলাম
আমি কিছু বলতে চাই
অনেক কাল হতে মনের গভীরে
লুকিয়ে থাকা ব্যাথা গুলোর কথা ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছদ্মনাম

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছদ্মনাম 

১) ভানুসিংহ ঠাকুর

২) অকপট চন্দ্র ভাস্কর
৩) আন্নাকালী পাকড়াশী
৪) দিকশূন্য ভট্টাচার্য
৫) নবীন কিশোর শর্মন
৬) ষষ্ঠীচরন দেবশর্মা
৭) বানীবিনোদ বিদ্যাবিনোদ
৮) শ্রীমতী কনিষ্ঠা
৯) শ্রীমতী মধ্যমা

Tuesday, April 16, 2013

জন্মদিন - শুভ দাসগুপ্ত

জন্মদিন - শুভ দাসগুপ্ত
আজ পয়লা শ্রাবণ।
খোকন, আজ তোর জন্মদিন।
তুই যখন জন্মেছিলি, আমরা তখন যাদবপুরে
নতুন গড়ে ওঠা কলোনীর টালির ঘরে। 
তোর ইস্কুল মাস্টার বাবা 
সেই হ্যারিকেনের আলো জ্বলা ঘরেই 
আনন্দে আর খুশিতে ঝলমলে হয়ে উঠেছিলেন 
তুই আসার পর। তোর নাম রেখেছিলেন -     সুকল্যাণ। 
মানুষটার মনটা ছিল শিশুর মতন 
অভাবে অনটনে, বেঁচে থাকার নানা দুর্বিপাকেও 
ভেঙ্গে পড়তেন না কখনও। সকলের ভাল চাইতেন মন থেকে। 
বলতেন দেখো একদিন এই দেশের মানুষ 
ঠিক খুঁজে পাবে মুক্তির পথ। শোষণ থেকে মুক্তি 
দারিদ্র থেকে মুক্তি অশিক্ষা থেকে মুক্তি...

আজ পয়লা শ্রাবণ 
খোকন, আজ তোর জন্মদিন।
ছোটবেলায়, তোর মনে আছে? আমাদের ভাঙ্গা মেঝেতে 
বাক্স থেকে বার করা মেজো-মাসীর হাতে তৈরি আসনটা
পেতে দিতাম। সামনে রাখতাম ঠাকুরের আসনের প্রদীপখানা।
তুই বসতিস বাবু হয়ে চুপটি করে।
তোকে আমরা একে একে ধান দুব্বো মাথায় দিয়ে আশীর্বাদ করতাম।
বাবা বলতেন বড় হও মানুষ হও।
তোর বাবার সেই বন্ধু -ঘোষ কাকা তিনি বলতেন 
বেঁচে বর্তে থাকো। 
তুই জিগ্যেস করতিস -মা, বর্তে মানে কি মা?
আমি শুধু তোর মাথায় ধান-দুব্বোই দিতাম। 
বলতাম না কিছুই। শুধু মনে মনে বলতাম 
ঠাকুর, আমার খোকনকে মস্ত বড় মানুষ করে তোলো
আমার খোকন যেন সত্যিই মানুষ হয়।
ওর যেন কখনো কোনো বিপদ না হয় ঠাকুর।
অভাবের সংসারে ওই একটা দিন- পয়লা -    শ্রাবণ 
কষ্টের পয়সায় একটু বাড়তি দুধ নিতাম। 
পায়েস রান্না করে দিতাম তোকে।
তুই খুব ভালবাসতিস পায়েস খেতে।
তোর বাবা বাসস্টান্ডের দোকান থেকে নিয়ে আসতেন 
তোর প্রিয় মিষ্টি ছানার গজা।
সামান্য ইস্কুল মাস্টারিতে কীই বা আয় হত;
ঘরে বসে ছাত্র পড়িয়ে আসতো কিছু।
দাউ দাউ অভাবের আগুনে সে রসদ পুড়তে সময় লাগত না।
তোর বাবার জামা সেলাই করতাম আর বার বার বলতাম 
আসছে মাসে একটা জামা বানিয়ে নিও।
উনি হেসে উঠে বলতেন; বাদ দাও তো, খোকন বড় হচ্ছে।
ওর জন্য ভাবছি দুধ রাখতে হবে আরো আধসের-
দুধে শক্তি বাড়ে। বুদ্ধি বাড়ে। শক্তি আরে বুদ্ধি না হলে 
তোমার খোকন মস্ত বড় মানুষ হয়ে উঠবে কি করে?
ভাবছি আরো দুটো টিউশনি নেব।

ছাত্র পড়িয়ে পড়িয়ে মানুষটা দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে যেতেন।
বারান্দার ধার ঘেঁষে যখন রাতের অন্ধকারে জোনাকির ব্যস্ততা,
আর ঘরে তোর পড়া মুখস্থ করার একটানা সুর 
আমাদের কলোনীর ভাঙ্গাচূড়া বাড়িটাকে জীবন্ত করে রাখতো-
তখন বলতেন আমায়; খাওয়া দাওয়া একটু করো - - তোমার চেহারাটা 
বড় ভেঙ্গে পড়ছে দিন দিন... শাড়িটাও তো দেখছি বেশ ছিঁড়েছে- 
কালই আমি ফেরার পথে একটা শাড়ি নিয়ে আসব। ধারেই আনব। 
আমি বলতাম-ধুর। সামনে খোকনের উঁচু ক্লাস-
কত বই পত্তর কিনতে হবে- কত খরচ। 
উনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যেতেন। 
জোনাকিরা নিঃশব্দ অদৃশ্য আলোর আলপনা আঁকত
উঠনের আগাছার ঝোপে।
আবহ সঙ্গীতের মত তুই ভেতরে বসে বসে পড়া মুখস্থ করতিস।
ইতিহাস, ভূগোল, গ্রামার।

ঈশ্বর আমাদের নিরাশ করেননি।
তুই কত বড় হলি।
সব পরীক্ষায় কত ভাল ফল হল তোর।
বাবা বললেন; আরও পড়। উচ্চ শিখাই উচ্চ সম্মানের 
এক মাত্র পথ। তুই আরও পড়লি।

তারপর...
তোর চাকরি হল কত বড় অফিসে 
মনে আছে খোকা? প্রথম মাসের মাইনে হাতে পেয়েই 
তুই কত কী কিনে এনেছিলি?
তখন তো আমরা উঠে এসেছি শ্যামবাজারে।
দু'কামরার বেশ সাজানো ঘোচানো গোছানো বড় ফ্লাট।
তোর অফিস থেকেই তো দিয়েছিল।
সেই বাড়ি সেই ঘর সেই বেলকনি- কত স্মৃতি- কত ছবি!
ঐ বাড়িতেই তো
আশ্বিনের ঝড়ো বিকেলে- -  তোর মনে আছে খোকন? 
তোর বাবা যেদিনটাতে চলে গেলেন - মনে আছে?
তুই বাবার বুকের ওপর পড়ে যখন কাঁদছিলি হাপুস নয়নে 
সদ্য স্বামীহারা, আমি সেদিন তোর সেই অসহায় মুখ দেখে 
আরো বেশি করে ভেঙ্গে পড়েছিলাম।
তোকে বুকে টেনে নিয়েছিলাম ছোটবেলার মত।
বলেছিলাম- 
কাঁদিস না খোকা। আমিতো আছি। 

আজ পয়লা শ্রাবণ 
কলকাতা থেকে অনেক দুরে মফস্বলের এই বৃদ্ধাশ্রমে 
আমি একেবারে একা, খোকন। 
তোকে বড় দেখতে ইচ্ছে করছে রে। 
তোকে, বৌমাকে আর ছোট্ট বিল্টুকে। 
তোরা এখন কত দুরে- 
সল্ট-লেকের মার্বেল বসানো ঝকঝকে বাড়িতে। 
আজ তোর জন্মদিনের নিশ্চয়ই খুব বড় পার্টি হচ্ছে-
তাই নারে খোকন? লোকজন, হৈচৈ, খাওয়া-দাওয়া।
খুব ভাল, খুব ভাল।
খোকন, আজ পয়লা শ্রাবণ
আমার বড় মনে পড়ছে যাদবপুরের ভাঙ্গা ঘরে রাত্রে 
তুই আমার পাশে শুয়ে মাঝে মধ্যে হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে 
জড়িয়ে ধরতিস আমাকে। আমি বলতাম, ভয় কী রে?
আমি তো আছি। মা তো আছে খোকনের। যার মা থাকে 
তাকে কী ভুতে ধরে? 
তুই নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তিস আমার বুক জুড়ে।
তোর আধুনিক সংসারে 
এই বুড়িটার একটু ঠাই হল নারে?
প্রতিমাও তো মা। ওরও তো আছে আমার খোকনেরই মত 
কোল আলো- করা এক চাঁদের টুকরো।
কিন্তু সময়ের কী আশ্চর্য পরিবর্তন!

খোকন!
তুই বোধহয় আর এখন পায়েস খাস না- তাই নারে?
তুই জানিস না খোকন 
আজ আমি সকালে পায়েস রান্না করেছি। হ্যাঁ 
তোরই পাঠানো টাকায়।
সারাদিন সেই পায়েসের বাটি সামনে নিয়ে বসে আছি রে।
এখানে এই বৃদ্ধাশ্রমে 
আমার একলা ঘরে 
আর কেউ নেই।
তুই একবার আসবি খোকন। 
একবার.... 
শুধু একবার...

বাতাসে লাশের গন্ধ - রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ


বাতাসে লাশের গন্ধ

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ 

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি,ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো-
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার,আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী, 
স্বাধীনতা - একি তবে নষ্ট জন্ম ?একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ?জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন। 
বাতাসে লাশের গন্ধ
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দুলে মাংসের তুফান।
মাটিতে রক্তের দাগ -
চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়
এ চোখে ঘুম আসেনা। সারারাত আমার ঘুম আসেনা-
তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার, নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ
মুন্ডহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস্য শরীর
ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। আমি ঘুমুতে পারিনা, আমি
ঘুমুতে পারিনা…রক্তের কাফনে মোড়া - কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।
স্বাধীনতা, সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন -
স্বাধীনতা - আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।

Sunday, April 7, 2013

প্রবন্ধ | Anandabazar


আমরা মাতামাতি না করলেই ওঁদের মঙ্গল

দোহাই, শাহবাগ প্রাঙ্গণে ভিড় জমানো জনগণের প্রতি একাত্ম হওয়ার আগ্রহে এমন কিছু যেন আমরা করে না ফেলি, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই মস্ত ক্ষতি করে বসবে।

অশোক মিত্র
কলকাতা, ৩ এপ্রিল ২০১৩

probondho
আমাদেরও? অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর সামনে। কলকাতা, মার্চ ২০১৩। ছবি- প্রদীপ আদক।
ঢাকা শহরের উত্তর উপকণ্ঠে শাহবাগ প্রাঙ্গণে অহোরাত্র মাতৃভাষা-প্রেমিকরা জড়ো হয়ে আছেন, তাঁরা প্রেরণার গান গাইছেন, প্রতিজ্ঞার গান গাইছেন, একটির পর আর-একটি কবিতা আবৃত্তি করে যাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, অথবা নজরুলের, দুই বাংলার ঘরে ঘরে যে-সব কবিতা প্রতিদিন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয় সে-সমস্ত কবিতা। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গানের প্লাবনে প্রাঙ্গণ ভেসে যাচ্ছে, যাঁরা জড়ো হয়েছেন, হচ্ছেন, আগামী দিনেও হবেন তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ যত ষড়যন্ত্রই হোক, যত নতুন নতুন বাধা পথ রোধ করে দাঁড়াক না কেন, যে মাতৃভাষার স্বপ্ন বুকে জড়িয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, জয়লাভ করেছিলেন, গোটা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন মাতৃভাষায় কী অমৃতের স্বাদ, সেই ভাষা তাঁদের জন্মগত অধিকার, কোনও দুশমনই ছিনিয়ে নিতে পারবে না। এ-পার বাংলায় আমরা যারা অধিষ্ঠান করছি তারা টেলিভিশনে-সংবাদপত্রে শাহবাগ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলির প্রতিবেদন দেখে এবং পড়ে উজ্জীবিত হই, কারও কারও হয়তো সাধ জাগে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে সেই জমাট ভিড়ের শরীরে নিজেদের মিলিয়ে দিই।
এখানেই সমস্যা আমরা বঙ্গভাষী হতে পারি, কিন্তু একটি ভিন্ন দেশের নাগরিক। ওখানকার ঘটনাবলির ছবি টেলিভিশনের পর্দায় আমরা যেমন এখানে বসে দেখি, শাহবাগ প্রাঙ্গণে অবস্থানকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে কলকাতায় যে-সব সভাসমিতি হচ্ছে, মিছিল শোভাযাত্রা বেরোচ্ছে, সে-সবের ছবিও বাংলাদেশ পৌঁছয়, শাহবাগ প্রাঙ্গণে অবস্থানরতদের যাঁরা ঘোর বৈরী, তাঁদের কাছেও পৌঁছয়, অপপ্রচারের দক্ষিণ দুয়ার উন্মোচিত হয়। হিন্দু ভারতবর্ষের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কতিপয় দেশদ্রোহী ইসলামের বিরুদ্ধে, আরব ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, শাহবাগ প্রাঙ্গণে জমায়েত হওয়া কুচক্রীদের প্রেরণা জোগানো হচ্ছে হয় কলকাতা থেকে নয় নতুন দিল্লি থেকে, বাংলাদেশকে ভারতবষের্র সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়ার অভিপ্রায়ে এটা অন্যতম প্রাথমিক উদ্যোগ।
একটু পুরনো বৃত্তান্তে প্রত্যাবর্তন করি। পাকিস্তাান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই মহম্মদ আলি জিন্না ঢাকা শহরে এলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সভা হল। ছাত্রদের ভিড়ে সভাগৃহ ঠাসা। জিন্না সাহেব চোস্ত ইংরেজিতে সুস্পষ্ট ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা একমাত্র উর্দু, অন্য কোনও ভাষা নয়। সঙ্গে সঙ্গে সারা কার্জন হল কাঁপিয়ে উচ্চনিনাদে ছাত্রদের নম্র অথচ সুদৃঢ় প্রতিবাদ, ‘কায়েদে আজম জিন্দাবাদ, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। জিন্নার মুখমণ্ডল থমথমে, তিনি আর একটি কথাও উচ্চারণ না-করে সভা থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। সেই তো শুরু, মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংহত থেকে সংহততর হল, ১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হত্যালীলায় যুগান্তের সূচনা, ঘরে ঘরে মাতৃভাষা-বন্দনা, ছেলেমেয়েরা বাবামায়েদের বোঝায়, আত্মীস্বজনদের কাছে যুক্তি দাখিল করে, যে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া বা শোনা সাধারণ্যে নিষিদ্ধ, গোপন শিক্ষায়তন খুলে তার অদম্য তালিম চলে। তার পর প্রায় দু’দশক ধরে প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের চোরাগোপ্তা লড়াই, যে লড়াই উপসংহারে পৌঁছেছে একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে। জামাতপন্থী অতি সামান্য কিছু মানুষজনকে বাদ দিলে গোটা জাতি একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হওয়ার, পারস্পরিক বিনিময়-প্রতিবিনিময়ের এবং জীবিকার্জনের প্রধান মধ্যবর্তিতা স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই ধারা অব্যাহতই ছিল। অস্বীকার করে লাভ নেই, বাংলাভাষার উন্মেষ ও ইতিহাস নিয়ে যত তন্নিষ্ঠ চর্চা বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তার ছিঁটেফোটাও হয়নি। মাতৃভাষার ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, ক্রিয়া প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যে গবেষণার স্তূপ বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গবাসী তা জেনে লজ্জা পাবেন। বাংলাদেশের মন্ত্রী বা আমলারা তাঁদের ভাষণে মাতৃভাষার যে বিশুদ্ধতা বজায় রাখেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসকরা তা থেকে পর্যাপ্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। এমনকী ঘরোয়া কথোপকথন ও আলোচনায় যে পরিস্রুত বাংলা ঢাকা, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে শ্রুত হয়, এ বাংলায় আমরা বিস্ময়ে অভিভূত না-হয়ে পারি না।
এই বিবর্তন সবাই ঔদার্যের সঙ্গে মেনে নিয়েছিলেন, সেই সঙ্গে কিছু প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্ন আত্মগরিমাবোধও ছিল। হঠাৎ ঈশান কোণে মেঘ দেখা দিয়েছে ঘরোয়া রাজনীতির সূত্র ধরে। মুক্তিযুদ্ধ পর্বে অনেক বর্বর নৃশংসতা ঘটেছে, যাঁর শেষ পর্যন্ত অখণ্ড পাকিস্তান তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, তাঁরা ১৯৭১ সালের পর কিছু দিন গা-ঢাকা দিয়েছিলেন, আস্তে আস্তে গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছেন। অভিযোগ, এঁদের কেউ কেউ পাকিস্তানি চর হিসেবে নিজেদের নিযুক্ত করে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সে-সময় ধরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের উপর বীভৎস অত্যাচার চালানো হয়েছিল, অনেককে নারকীয় কায়দায় খুন করা হয়েছিল পর্যন্ত। এই পর্বে যাঁরা শহিদ হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ যেমন ছিলেন, সেই সঙ্গে একগুচ্ছ আইনজীবী, শ্রমিক বা কৃষক নেতার মতো মানুষজনও ছিলেন।
চার দশক গড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রিয়জনদের অমনধারা নিধন যাঁরা মেনে নিতে পারেননি, তাঁরা এতগুলি বছর ধরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, তাঁদের আত্মজনদের নিধনে যারা প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ ভাবে অংশীদার ছিল, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের ব্যবস্থা করবেন, ফাঁসিতে লটকাবেন পর্যন্ত। তাঁদের অধ্যবসায় এত দিনে এক অর্থে সার্থক। এ-রকম কিছু অপরাধীকে চিহ্নিত করা গেছে, একটি বিশেষ আইন প্রয়োগ করে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি কয়েক জনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে পর্যন্ত। এখানেই বিপত্তির উদ্ভব। বিশেষ আইনটি প্রয়োগ করার প্রশ্নে বাংলাদেশ যেন দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে। চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর আগে সংগঠিত অপরাধের জন্য এখন প্রাণদণ্ডের বিধান কতটা যুক্তিযুক্ত তথা ন্যয়সঙ্গত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দু’দিকেই যুক্তি-প্রয়োগে আবেগের সংমিশ্রণ। যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য প্রাণদণ্ড ঘোষণার এই নিদান প্রধান বিরোধী বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির আদৌ পছন্দ নয়। তাঁদের সন্দেহ, এই আইনের অপপ্রয়োগ ঘটতে পারে এবং শাসকগোষ্ঠীর না-পসন্দ অনেককেই হয়তো এই অপপ্রয়োগ-বলে পদে-পদে জেরবার হতে হবে। গোলমেলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এরই মধ্যে বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির নেত্রী আইনটির প্রতিবাদে দেশ জুড়ে হরতালের ডাক দিলেন। হঠাৎ ভারত সরকারের একটি অবিবেচনার জন্য বিদেশ নীতির ঘোলা জল আর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল একাকার হয়ে গেল। বাংলাদেশ জুড়ে তর্কবিতর্ক চলছে, সুযোগ বুঝে জামাতপন্থীরা বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে আলতো গাঁটছড়া বাঁধছেন বা বাঁধার চেষ্টা করছেন এমন অবস্থায় কোনও কৌশলে ভারতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফর স্থগিত রাখতে পারতেন, তা করা হল না। জামাতপন্থীদের ফের মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রচেষ্টার প্রতিবাদে শাহবাগ প্রাঙ্গণে মাতৃভাষা-অনুরাগীরা জড়ো হতে থাকলেন। অতি পবিত্র তাঁদের উচ্চারণ, ধর্মান্ধদের রোষ থেকে তাঁরা মাতৃভাষাকে সর্বপ্রহর রক্ষা করবেন, প্রতিজ্ঞার বহু বর্ণিল দীপ্তিতে শাহবাগের আকাশ রঞ্জিত। কিন্তু তা হলেও একটি শূন্যতাবোধ: বেগম জিয়ার সমর্থকরা এখানে গরহাজির, জাতির একটি অতুচ্ছনীয় অংশের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত।
এটা ভাবনার কথা। এর সঙ্গে যা যোগ করতে হয় মাতৃভাষার জন্য এই যে নতুন সংগ্রাম তা কিন্তু তাঁদেরই একান্ত। একষট্টি বছর আগে ছাত্রদের রক্তে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ প্লাবিত হয়, তখন ভারতবর্ষীয় আমরা কেউ ধারেকাছে ছিলাম না। ধীরে ধীরে সেই ছাত্র অভ্যুত্থান জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের আদল পেয়েছে, সেই আন্দোলনের একেবারে শেষ মুহূর্তে ভারতবর্ষ থেকে খানিকটা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শাহবাগ প্রাঙ্গণে যে নতুন একটি আবেগের স্ফূরণ, তা-ও কিন্তু ও-পার বাংলার মানুষদের সত্তার গভীর থেকে উৎসারিত। গত পঞ্চাশ ষাট বছরে বার্তা বিনিময় প্রতিবিনিময়ে অনেক প্রগতি ঘটেছে। আগের সন্ধ্যায় শাহবাগ প্রাঙ্গণে কে কী বললেন, কে কী গাইলেন, যূথবদ্ধ কী অঙ্গীকার করা হল, সমস্ত খবরই পর দিন সকালে কলকাতায় বসে আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে পারি। বাঙালি আবেগের আমরাও তো অংশভুক, আমাদের অনেকেরই মধ্যে বাসনা জাগতে পারে শাহবাগ প্রাঙ্গণের সম্মিলিত উচ্চারণের সঙ্গে আমাদের উচ্চারণ মিলে যাক, আমরাও যেন অ্যাকাডেমির বাইরের প্রাঙ্গণে দ্রুত-ছায়া-নেমে-আসা অপরাহ্ণে শাহবাগ প্রাঙ্গণের অঙ্গীকৃত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে গলা মেলাই। কিন্তু ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি তাঁর সফরেরে তারিখ না-পাল্টে যে ভুল করেছেন, আবেগের বশে মুহ্যমান হলে তারই আর এক দফা মাসুল গুনতে হবে। শাহবাগ প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া বন্ধুদের যাঁরা রাজনৈতিক শত্রু, তাঁরা গলা ফাটিয়ে প্রমাণ করতে চাইবেন, বাংলাদেশের আকাশে যে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, গোপনে ও প্রকাশ্যে তার ইন্ধন জোগাচ্ছে দুশমন ভারতীয়রা।
দোহাই, শাহবাগ প্রাঙ্গণে ভিড় জমানো জনগণের প্রতি একাত্ম হওয়ার আগ্রহে এমন কিছু যেন আমরা না-করে ফেলি, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই মস্ত ক্ষতি করে বসবে, বাংলাদেশের লড়াইটা বাংলাদেশিদেরই লড়তে দিন না কেন!
ভয়ে-ভয়ে অন্য একটি অনুরোধ কি করতে পারি? আপনি যদি যে-কোনও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত হতে আঁকুপাঁকু বোধ করছেন, একটা কাজ করুন না কেন। সম্ভ্রান্ত সচ্ছল ঘরের যে বাঙালি বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানদের যাতে এমনকী মাধ্যমিক স্তরেও ওই বিতিকিচ্ছিরি বাংলা ভাষায় তালিম দিতে না হয়, তার জন্য কলকাতা জুড়ে নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামুন না!
 আনন্দবাজার পত্রিকা