Thursday, October 25, 2012

মহিলা নির্যাতন রোধ নয়, অন্ধবিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখতে অর্থ বরাদ্দ করে কর্ণাটক সরকার




  মহিলা নির্যাতন রোধ নয়, অন্ধবিশ্বাস অক্ষুণ্ণ  রাখতে অর্থ বরাদ্দ করে কর্ণাটক সরকার  


‘‘আমাকে এখানে আরও একমাস বসবাস করতে হবে। তারপর আমাকে স্নান করে মন্দিরে যেতে হবে, সেখানে আমার সন্তানের নামকরণ হবে। শুধুমাত্র তারপরেই আমি বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি পাবো।’’ মাত্র ২০ দিনের সন্তানের মা জয়াম্মা, ছোট্ট ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এসে এই কথাগুলি জানালেন। ভরা বর্ষায় গ্রাম থেকে দূরে চাষের জমির মাঝে একাকী দিন কাটাচ্ছেন। বাড়ির লোকজন তাঁর খাবার ঝুপড়ির পাশে রেখে চলে যায় বা থালায় ফেলে দেয়। যাতে তারা ‘‘দূষিত’’ না হয়ে যায়। কর্ণাটকের হিরিয়ুর তালুকের দিণ্ডাভারা পঞ্চায়েতের অন্তর্গত সুরাপ্পানাহাট্টিতে কাডু গোল্লা পশুপালক গোষ্ঠীর ২০০ ঘরের বসবাস। জয়াম্মা সেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন। কর্ণাটকে গোল্লা বা পশুপালক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বিভাজন রয়েছে। প্রধান দু’টি ভাগ হলো ‘‘ওরু গোল্লা এবং ‘‘কাডু গোল্লা’’। উত্তর ভারতের যাদব সম্প্রদায় থেকে এদের উৎপত্তি বলে কথিত রয়েছে। ওরু গোল্লা গোষ্ঠীর মানুষজন শহরাঞ্চলে বাসস্থান গড়লেও, বিপরীতে কাডু গোল্লা সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে নিজস্ব ক্ষুদ্রপল্লী গঠন করে যা হাট্টি বলে পরিচিত। মূলত শহরের প্রান্তে বা বৃহৎ গ্রামাঞ্চলের, এমনকি জঙ্গল ঘেঁষা অঞ্চলে তারা এই পল্লী নির্মাণ করে। কাঁটা‍ঝোপের বেড়া দিয়ে ঘেরা এদের বাসস্থানকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

যাযাবর প্রকৃতির এই কাডু গোল্লা সম্প্রদায়ের মানুষ অতীতে গোরু ও ছাগল পালন করতেন। ইতোমধ্যে স্বল্পসংখ্যক মানুষ ক্ষুদ্র জমির মালিকানা লাভে সমর্থ হয়েছেন। শিক্ষিত অংশটি শহর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। এদের মূলত চিত্রদুর্গ ও টুমকুর জেলায় দেখা যায়। এছাড়াও এদের উল্লেখযোগ্য অংশকে পার্শ্ববর্তী হাসান জেলায় দেখতে পাওয়া যায়। বিচ্ছিন্নভাবে কর্ণাটকজুড়েই এদের লক্ষ্য করা যাবে এবং অন্ধ্র প্রদেশের কিছু অংশেও তারা বসবাস করেন । ১৯৯০ সালে কর্ণাটকের তৃতীয় অনগ্রসর শ্রেণী কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে গোল্লারা হলো রাজ্যের ১.৩শতাংশ জনগণ। এরমধ্যে কাডু গোল্লাদের শতাংশ পৃথকভাবে না থাকলেও অনগ্রসর শ্রেণী ও সংখ্যালঘু মন্ত্রকের হিসেবে চিত্রদুর্গ জেলায় প্রায় ২৫১টি কাডু গোল্লা পল্লী রয়েছে। যার জনসংখ্যা প্রায় ১লক্ষ। সংলগ্ন জেলাগুলির হিসাব যোগ করলে কর্ণাটকে এই জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান প্রায় ৩লক্ষ দাঁড়াবে। অত্যন্ত ধর্মভীরু এই সম্প্রদায় সমাজের মূলস্রোত থেকে নিজেদের পৃথক করে রেখে নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বাতাবরণকে অনেকখানি বহির্প্রভাব থেকে রক্ষার নামে সামাজিক কুপ্রথাকে লালন করে যেতে সক্ষম হচ্ছে। যার মূল শিকার হচ্ছেন সমাজের মহিলারা। কর্ণাটকের কুভেম্পু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এম গুরুলিঙ্গাইয়া তাঁর উপজাতি সংস্কৃতি সংক্রান্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন — ‘‘এরা মনে করে যে তাদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রিত ও পরিপুষ্ঠ হয় একধরনের অপ্রাকৃতিক, আত্মিক ও জাদুশক্তির দ্বারা। কাডু গোল্লাদের সমগ্র জীবনধারাটি ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলা যায়। এরা বিভিন্ন দেব-দেবী, আত্মা ও ভূত-প্রেতে আস্থা রাখে, যা তাদের সমগ্র জীবনপ্রণালীকে নির্দেশিত করে থাকে।’’

কাডু গোল্লাদের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে একটা অস্বাভাবিক ধারণা রয়েছে। তারা মনে করে কোনো মহিলা তার ঋতুচক্রের সময়পর্বে বা সন্তানপ্রসবের পরবর্তীতে সে অশুদ্ধ। সেই সময় তাকে গ্রামের বাইরে তিন থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত থাকতে হবে প্রতিমাসে। প্রসূতি মহিলাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা দু’ থেকে তিন মাস পর্যন্ত গড়ায়। এই পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মীয় সমাজে ঋতুচক্রের মতো জৈব প্রক্রিয়া ‘‘অভিশাপ’’, যার পরিণতিস্বরূপ রক্তপাত হয়। এই ধারণা এতটাই বদ্ধমূল কাডু গোল্লা সমাজে যে এমনকি সম্প্রদায়ভুক্ত শিক্ষিত পেশাজীবী মানুষরাও এই মতকে গ্রহণ করেন। চিত্রদুর্গ জেলার চাল্লাকেরে শহরের সরকারী কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এইচ আজ্জাইয়ার মন্তব্য — ‘‘আমরা যখন হাট্টিতে ফিরে যাই, আমাদেরকে বিশুদ্ধতা সংক্রান্ত নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয়।’’ — এই ধারণাকেই পুষ্ট করে, যদিও গ্রামীণ হাট্টির তুলনায় শহর সংলগ্ন হাট্টিগুলিতে এই অন্ধ কুসংস্কার তুলনামূলক কম বলে অনেকে মনে করেন। চাল্লাকেরে শহরের কাটাপুনো হাট্টিতে এ ধরনের অন্ধ কুসংস্কার মানা হয় না বলে অনেকে বলে থাকেন।

কর্ণাটকে গোল্লা সম্প্রদায় ‘‘যাযাবর ও প্রায় ভবঘুরে আদিবাসী’’ হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯০-র দশকের প্রথমভাগে গোষ্ঠীর লোকজন রাজ্যজুড়ে মিছিল করলে কর্ণাটক সরকার ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাদেরকে সবচেয়ে অনগ্রসর আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শিক্ষা ও সরকারী চাকরিতে ৪ শতাংশ সংরক্ষণ ঘোষণা করে। কাডু গোল্লারা তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এদের মধ্যেকার কুসংস্কার দূর করে মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধান ও শিশুমৃত্যুর হার রোধ করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু তারা যেকোন স্বাস্থ্য কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার কথাই জানিয়েছেন। এমনকি মাত্র ৩০ বছর বয়সী মহিলারাও হিস্টেরকটমি অপারেশন করাচ্ছেন। প্রসূতি মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনেও কোন গ্রামবাসী তাঁকে স্পর্শ করেন না। স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিজ্ঞতা হলো যে, গ্রামের সর্বত্র ঘুরে যাওয়ার পরেই গ্রামের বাইরের ঝুপড়িতে অবস্থানরত মহিলাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে।

এই ঘৃণ্য কুসংস্কার থেকে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জনগণকে মুক্ত করার কোনো সরকারী উদ্যোগ না থাকলেও ‘‘মহিলা ভবন’’ গ‍‌ড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা অনুসারে বিভিন্ন হাট্টিতে তা তৈরি করা হচ্ছে কাডু গোল্লাদের ‘‘অভিনব সাংস্কৃতিক প্রথা’’কে সম্মান জানিয়ে। শুধু চিত্রদুর্গ জেলায় ইতোমধ্যে ১৩টি মহিলা ভবন গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ৬৫লক্ষ টাকা ব্যয় করে। আবার গ্রাম পঞ্চায়েত অনেক ক্ষেত্রে এই নবনির্বিত গৃহকে পঞ্চায়েতের সম্পত্তি বলে ঘোষণা করছে, মহিলা ভবন নয়। কর্ণাটক সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সমালোচিত হচ্ছে। আদতে এই ঘরগুলি অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এবং মহিলাদের প্রতি পরিহাসস্বরূপ এই ঘটনা আধুনিক ভারতের যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে তা মর্মান্তিক। যাদব সম্প্রদায়কে শিক্ষিত করে তুলে এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও সনাতন প্রথা থেকে বের করে আনার উদ্যোগ না গ্রহণ করে সস্তা সমর্থন লাভের আশায় যে কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে তা সমস্ত অংশের যুক্তিবাদী জনমতের পক্ষে নিন্দা করা হয়েছে। বিভিন্ন মহিলা সংগঠনের পক্ষে দাবি জানানো হয়েছে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের বাসস্থান এলাকাগুলিকে রাজস্ব গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করে বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পের সুযোগ তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে শিক্ষার ও স্বাস্থ্যের মান বাড়িতে তুলতে হবে। চিত্রদুর্গ, টুমকুর, হাসানের রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত বাসস্ট্যান্ড, গাছতলা, পরিত্যক্ত বাড়ি, গোয়ালঘর এমনকি খোলা আকাশের নিচে বা ছোট্ট ঝুপড়িতে মহিলারা দিন কাটাচ্ছেন দেখতে পাওয়া যাবে। যদিও আজকের দিনে ঐ সম্প্রদায়েরই মহিলা ও যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু প্রবীণ জনমত ও পুরোহিতরা এই ঘৃণ্য প্রথাকে মদত জোগাচ্ছে। সংস্কারের পক্ষে যখন মনোভাব জোরালো হচ্ছে, তখন রাজ্য সরকারকে অবশ্যই নীতি গ্রহণ করতে হবে যা এই প্রথাকে দূর করতে সহায়ক হবে। সংস্কারকদের পক্ষ গ্রহণ করতে হবে কুপ্রথাকে মদত জোগানোর পরিবর্তে। 


সৌজন্যেঃ- গণশক্তি (সম​য়ের সাথে)

র‌্যাচেল কেরি— নিষ্ঠুর বিচার



  র‌্যাচেল কেরি— নিষ্ঠুর বিচার  

     

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য


র‌্যাচেল কেরি— একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদের আরেক নাম। সাম্রাজ্যবাদী পেশিশক্তির বর্বরতম খুনের অন্যতম প্রতীক। ২০০৩ এর মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের গাজা ভূখণ্ডে ইজরায়েলী সেনাবাহিনীর বুলডোজার পিষে মেরে ফেলেছি‍‌লো ২৪ বছর বয়সী মার্কিন যুবতী র‌্যাচেলকে। তার অপরাধ, প্যালেস্তা‍‌ইনের সমর্থনে গলা ফাটানো, গাজা ভূখণ্ডে ইজরায়েলী সরকারের আক্রমণে গৃহহীন অসহায় মানুষগুলোর পাশে সহমর্মিতায় দাঁড়িয়েছিলেন র‌্যাচেল। আন্দোলন করছিলেন, Inte

ation Solidarity Movement এর অন্যতম সদস্যা হিসেবে।

র‌্যাচেল এর মৃত্যুর পর তার পরিবার ইজরায়েলের আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন, যাতে তাদের আইনজীবী পরিষ্কারভাবে র‌্যাচেলের মৃত্যুর জন্য ইজরায়েলী সেনাবাহিনীকে দায়ী করে তার বক্তব্য পেশ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ শুনানির শেষে ৯ বছর পরে আগস্ট ২০১২ তে ইজরায়েল এর ‍‌ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট রায় দি‍লো ইজরায়েলী সেনাবাহিনীর স্বপক্ষেই। র‌্যাচেল এবং ISM -এর কর্মকাণ্ডকে বলা হলো, ‘বেআইনী, হটকারিতা’। পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, ইজরায়েলী সরকারের চাপে পড়ে কোর্টের এই একতরফা সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির চাপে বাধ্য হয়ে শেষপর্যন্ত তেল আভিভ-এ নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বাধ্য হন বলতে ‘তদন্তে ত্রুটি ছিলো, আরও স্বচ্ছ্বতার প্রয়োজন ছিলো। অথচ র‌্যাচেল কিন্তু ছিলো মার্কিন নাগরিক। মার্কিনী রাষ্ট্রদূতের প্রতিক্রিয়াটি একেবারেই লঘু, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের অন্যতম দোসর হলো ইজরায়েল, ওবামার এক নম্বর ঘনিষ্ঠ সহযোগীও বটে।

র‌্যাচেলকে খুনের এই মামলাটি যাতে গুরুত্ব হারায়, সেটা করতে ইজরায়েল প্রশাসন চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখেনি। প্রথমেই, যে চিকিৎসক র‌্যাচেলের মৃতদেহ পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সুনিশ্চিত রিপোর্ট দেন। সেই চিকিৎসকে আদালতে জবানবন্দী দেওয়ার ব‌্যাপারে সরকারী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী কারোরই বক্তব্য কোর্টে গ্রাহ্য করা হয়নি। বিচারক ওতেত গারসন তার রায়দান প্রক্রিয়ার সময় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এটি একটি দুর্ঘটনা, এরজন্য কোনভাবেই ইজরায়েলী প্রশাসন বা সেনাবাহিনীকে দায়ী করা যুক্তিযুক্ত নয়। র‌্যাচেল নিজে ইচ্ছে করেই বুলডোজারের সামনে এসেছিলেন, একজন দায়িত্ববান, সুস্থ মহিলা কখনই এমন কাজ করেন না’।

বিশ্বের সকল প্রগতিশীল প্রতিবাদী মানুষের কাছে এই রায়ের কোন মূল্য নেই এবং ইজরায়েলী প্রশাসন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত সে দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কেও পৃথিবীর মানুষ অবহিত হওয়ার সুযোগ পেলেন।

বিচারক গারসন তার ৬২পাতার রায়ে ইজরায়েলী সেনাবাহিনীর বিন্দুমাত্রও কোন দোষত্রুটির কথা উল্লেখ করেননি অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী ঘটনাটি ছিলো : ‘গাজা ভূখণ্ডে প্যালেস্তিনীয় সমর্থক জনৈক নাসারেল্লার বাড়িটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে আস‍‌ছিলো ইজরায়েলী সেনাবাহিনীর বুলডোজারটি। র‌্যাচেল বাধাদান করতে এগিয়ে আসে একটি লাউডস্পিকার হাতে নিয়ে, আসেপাশে কিছু প্যালেস্তিনীয় সমর্থকও ছিলো। কিন্তু বুলডোজারের গতি কমেনি, বিন্দুমাত্র মানবিকতাবোধটিকেও দূরে সরিয়ে রেখে র‌্যাচেলকে প্রথম ধাক্কায় মাটিতে ফেলে তার ওপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয় প্রাণহন্তা যান্ত্রিক বস্তুটি। রীতিমতো আওয়াজ হয়ে ভেঙে যায় র‌্যাচেলের শরীরের সমস্ত হাড় ও তার মাথার খুলি।’

পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম নারকীয় ও বর্বর হত্যাকাণ্ড। ইজরায়েল সরকারের নিয়ন্ত্রিত ‘পুতুল’ বিচারক ও তার বিচারসভা কোন কথাই শুনতে চায়নি।

র‌্যাচেলের মা কান্তি কেরি কো‍‌র্টের বাইরে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুধু আমাদের পরিবারের জন্যই নয়, সারা পৃথিবীর মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এই রায় চূড়ান্ত হতাশাজনক এবং আজকের দিনটি মানবতা-বিরোধী দিন হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে রইল।’ র‌্যাচেলের পক্ষে দাঁড়ানো আইনজীবী হুসেন আবু হুসেনের কথায়, ‘এই রায় আগামীদিনে ইজরায়েলী সেনাবাহিনীকে আরও উদ্বুদ্ধ করলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে।’

গাজা ভূখণ্ডে ২০০০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত চার বছরের মধ্যে মার্কিন মদতপুষ্ট ইজরায়েল সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে প্রায় ২৫০০ প্যালেস্তিনীয় সমর্থকের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে বুলডোজার দিয়ে। গৃহহীন হয়েছেন প্রায় পঁচিশ হাজার নিরপরাধ মানুষ এবং সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক, পূর্ববর্তী কোন ঘোষণা ছাড়াই ধ্বংস করা হয়েছে গরিব মানুষের বাসস্থানগুলো। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই নিষ্ঠুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো র‌্যাচেল। বিগত আট বছর ধরে চলতে থাকা র‌্যাচেল হত্যার এই বিচার প্রক্রিয়াটিতে ইজরায়েল কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন মদত পেয়ে আসছে। প‌্যালেস্তাইনের ওপর আক্রমণের ধারও ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে ইজরায়েল। নিশ্চুপ সারা পৃথিবীর স্বঘোষিত গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার পাহারাদার আমেরিকা।
সৌজন্যেঃ- গণশক্তি (সম​য়ের সাথে)


Tuesday, October 16, 2012

পুষ্টির ঘাটতি



  পুষ্টির ঘাটতি  

কেয়া পাল

ভারতের জনসংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। চীনের পরই ভারতের স্থান। কিন্তু পুষ্টির গুরুত্বের দিক থেকে আমাদের দেশ সারা পৃথিবীর মধ্যেই পিছিয়ে রয়েছে। কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও এদেশের সব মানুষ দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না। অপুষ্টি তাই এদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই অপুষ্টির পেছনে রয়েছে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, পুষ্টিশিক্ষার অভাব প্রভৃতি কারণসমূহ। ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (আই সি এম আর) পুষ্টি বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। আই সি এম আর-র বিভিন্ন ধরনের গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, ভারতীয় মহিলারা পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে বিভিন্ন ধরনের রোগের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ভুগেছেন এবং অনেকেই অপুষ্টির কারণে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আই সি এম আর-র পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ভারতে মোট মৃত্যু সংখ্যার ৪০% হলো ‍‌‍‌শিশু, যাদের বয়স মূলত ৬বছরের মধ্যে। অথচ একটি উন্নত দেশে এই জাতীয় শিশু মৃত্যুর হার মাত্র ৪%।

আই সি এম আর-এর গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভারতীয়দের খাদ্যে ক্যালোরির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম।

জাতীয় পুষ্টি মনিটরিং ব্যুরো (এন এন বি এন) যে ‍‌রিপোর্ট পেশ করেছে তাতে দেখা গেছে বর্তমানে ভারতের জনগণের ৫০% পরিবার যে ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে তাতে‍‌ প্রোটিন, শক্তি উভয়েরই যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এক্ষেত্রে মানুষের দারিদ্র্যের সঙ্গে পুষ্টি বিষয়ক জ্ঞানের অভাবও এক‍‌টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা যায়।

ভারতীয়দের মধ্যে ক্যালোরি এবং প্রোটিন ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের অভাব লক্ষ্য করা যায়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ভিটামিন এ’, ‘ভিটামিন বি কমপ্লেক্স’, লৌহ, প্রভৃতি। সমীক্ষায় জানা গেছে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু মানুষ, বিশেষ করে মহিলা ও শিশুরা ‘ভিটামিন এ’ জনিত অপুষ্টির কারণে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে। আজও লক্ষ লক্ষ মহিলা চোখের রোগে ভুগছেন। লৌহের অভাবে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি নারী এবং শিশুরা অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা রোগের শিকার হচ্ছে। ‘ভিটামিন বি কমপ্লেক্স’-র অভাবে মহিলা ও শিশুরা গ্লোসাইটিস, চিলোসিস প্রভৃতি রোগে কষ্ট পাচ্ছেন।

ভারতের প্রতিটি নাগরিক (মহিলা ও শিশু) কী জাতীয় খাদ্য কত পরিমাণ গ্রহণ করে তাতে কী পরিমাণ পুষ্টিমূল্য তথা ক্যালোরি থাকে এসব নিয়ে দেশজুড়ে গবেষণামূলক সমীক্ষা চালিয়ে পুষ্টি বিষয়ক জাতীয় প্রতিষ্ঠান (এ আই এন) যেসব তথ্য প্রকাশ করেছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতীয় মহিলারা প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পরিমাণ শস্যজাতীয় খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করেন। তাঁরা দৈনিক গ্রহণ করেন ৪৮৬গ্রাম শস্যজাতীয় খাদ্য। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরা দৈনিক এই জাতীয় খাদ্যগ্রহণ করেন ৪৩৫গ্রাম। মোট কথা ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে শস্য জাতীয় খাদ্যকণাই প্রধান খাবার হিসাবে গৃহীত। এইসব শস্য জাতীয় খাদ্যের মধ্যে থাকে চাল, গম, যব, জোয়ার, বাজরা এবং রাগি। সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে, ভারতীয় মহিলাদের মোট ক্যালোরি এবং প্রোটিনের সিংহভাগই (প্রায় ৮০%) আসে শস্যকণা থেকে।

ভারতীয় মহিলাদের প্রতিদিন মাথাপিছু ৭০গ্রাম ডাল গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু প্রতিদিন তাঁরা গড়ে ডাল গ্রহণ করেন মাত্র ৪১গ্রাম যা প্রয়োজনের তুলনায় ২৯গ্রাম করে কম। যদিও পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা দৈনিক ৪৭গ্রাম ডাল গ্রহণ করে। সারা ভারতের নিরিখে বিহার, মধ্য প্রদেশ এবং উত্তর প্রদেশের অধিবাসীরা তুলনামূলকভাবে বে‍‌শি মাত্রায় ডাল গ্রহণ করেন। অন্যদিকে অন্ধ্র প্রদেশ, কেরালা, জম্মু-কাশ্মীর এবং তামিলনাডুর বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে কম ডাল খান।

আই সি এম আর-র সমীক্ষা থেকে জানা গেছে ভারতীয়দের ডাল এবং শস্য জাতীয় খাদ্য গ্রহণের অনুপাত ১:১২। কিন্তু এই অনুপাত হওয়া উচিত ১:৫, কেননা ডালের মধ্যে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং খাদ্যশস্যের মধ্যে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রোটিন একত্রে দেহে গৃহীত হলে তা মহিলাদের দেহ গঠনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালনে সাহায্য করে।

পুষ্টি বিষয়ক জাতীয় সমীক্ষা থেকে আরও জানা যায়, ভারতীয় মহিলাদের খাদ্যে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল, ইত্যাদি ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্যের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তবে একথা ঠিক যে, মহিলাদের শারীরিক গঠন, দৈহিক সুস্থতা বজায় রাখা, কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য এইসব খাদ্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। তবুও আর্থিক কারণে, কোথাও ধর্মীয় গোঁড়ামি, আবার কোথাও বা কুসংস্কারের ফলে এইসব খাবার তাঁদের খাদ্য তালিকায় থাকে না। রাজস্থান, হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং মধ্য প্রদেশের মানুষ ছাড়া অন্যান্য রাজ্যের মহিলা ও শিশুরা দুধ এবং দুগ্ধজাত খাদ্য তুলনামূলকভাবে কম গ্রহণ করেন।

ভারতবর্ষের উৎপাদনের ঘাটতি এবং বাজারে আমদানি না হওয়ার কারণেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মহিলা ও শিশুরা বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে খান। তাছাড়া, ভারতীয় মহিলাদের খাদ্যে আর একটি বড় ঘাটতি হলো স্নেহ পদার্থ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার গড়ে দৈনিক স্নেহজাতীয় পদার্থের পরিমাণ হওয়া উচিত ৩৮গ্রাম। কিন্তু বাস্তবে লক্ষ্য করা যায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা দৈনিক ১৯গ্রাম স্নেহপদার্থ গ্রহণ করেন। এটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। স্নেহপদার্থ যেহেতু ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে- র শোষণে সাহায্য করে, তাই স্নেহপদার্থের অভাবে এই সব ভিটামিন খাদ্যের মাধ্যমে দেহে গৃহীত হলেও তা মহিলাদের দেহের মধ্যে পুরোমাত্রায় শোষিত হয় না।

ওপরের বিভিন্ন সমীক্ষা ও গবেষণামূলক তথ্য থেকে বোঝা যায় ভারতীয় মহিলা ও শিশুদের মধ্যে পুষ্টিগত ঘাটতি এক‍‌টি অন্যতম সমস্যা। পুষ্টির এই ঘাটতি মেটাতে না পারলে সামগ্রিকভাবে মহিলা ও শিশুদের শারীরিক বিকাশ সম্ভব নয়। একমাত্র সুষম আহারই পারে এই ঘাটতি মেটাতে।
সৌজন্যেঃ- গণশক্তি (সম​য়ের সাথে)

সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন



সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন :- 


অশোক দাস

            বিগত শতকের তিন-চারের দশকে ‘বিচিত্রা’ ‘ভারতবর্ষ’ ‘বঙ্গশ্রী’ ‘সাহানা’ ‘দুন্দুভি’ ‘খেয়ালী’ ‘ছন্দা’ ‘দীপালি’ ‘প্রবাসী’ ইত্যাদি মাসিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলি খুললেই চোখে পড়তো একটি বিশেষ বিজ্ঞাপন ‘সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন।’ এছাড়াও তখন হিজ মাস্টার্স ভয়েস, টুইন, হিন্দুস্থান রেকর্ডস, রিগ্যাল, মেগাফোন, সেনোলা, পাইওনিয়ার ইত্যাদি গ্রামোফোন কোম্পানিগুলি থেকে যে নিয়মিত ক্যাটালগ প্রকাশিত হতো তাতে এই বিজ্ঞাপনটি থাকতো, সাথে থাকতো একটি বক্স গ্রামোফোনের ছবি। হিজ মাস্টার্স ভয়েস-এর ক্যাটালগে একাধিক মডেলের গ্রামোফোনের ছবি থাকতো। বক্স গ্রামোফোন, চোঙাওলা গ্রামোফোন এবং নানা মাপের টেবিল গ্রামোফোনের ছবি ও তাদের দাম লেখা থাকতো এই সমস্ত বিজ্ঞাপনে। আমাদের বাড়িতে ‍‌ যখন এইসব পত্রিকা আর ক্যাটালগ আসতো, তখন আমি পৃথিবীর আলো দেখিনি। (বাবা নিত্যানন্দ কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান বাঁধতেন, সুর দিতেন, নিজেও গাইতেন। শচীন সেনগুপ্ত’র মতো নাট‌্যকারদের নাটকের জন্যেও গান লিখতেন। ছোট বড় পত্রিকায় তাঁর লেখা গানও ছাপা হতো।) 

আমাদের ছোট গ্রামটিতে আমাদের ছাড়া ডাক্তারবাবুদেরও একটি চোঙাওলা গ্রামোফোন ছিল! মহিম ডাক্তারবাবুর বড় ছেলে চারুবাবু কিনেছিলেন সেটি। বাজতো, ‘কাদের কূলের বৌ গো তুমি, কাদের কূলের বৌ’ অথবা কানা কেষ্ট অর্থাৎ কৃষ্ণচ্ন্দ্র দে-র গান ‘ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না বধূ ঐখানে থাকো’, অথবা ইন্দুবালার গাওয়া কাজীর গান ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর।’ সে সুরের সাথে আজকের সুর মেলে না! চারুবাবুর সেজভাই ডাক্তার ছিলেন। তিনি অবশ্য গ্রামোফোন কেনেননি। পরে অনেক পরে চারুবাবুর ছোটছেলে বাদলকাকু কিনলেন বক্স গ্রামোফোন—সিঙ্গল স্প্রিং-এর। কুকুরের ছাপওয়ালা হিজ মাস্টার্স ভয়েস অথবা যমজ শিশুর ছবিওয়ালা টুইন পিনের বাক্স থেকে পিন বের করে তা সাউন্ড বক্সে ফিট করে স্প্রিং-এ দম দিয়ে রেকর্ডটি একটি প্লেটে চাপিয়ে দিয়ে ‘অন’ করলেই রেকর্ডটি ঘুরতে থাকতো এবং যত্ন করে রেকর্ডের কোণায় পিনটি লাগিয়ে দিলেই বেজে উঠতো মিউজিক, ভেসে আসতো ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গলা ‘শোনা শোনো, কথাটি শোনো’ আমরা পুলকে শিউরে উঠতাম এই আজব কুদরতি দেখে।

মনে পড়ে, প্রতিমা রঙ করা হয়ে গেছে, বীরভূমের হজরতপুরের ত্রিভঙ্গ মিস্ত্রিমশাই তাঁর ছেলে গোপালকে নিয়ে প্রতিমায় বার্নিশ লাগাচ্ছেন, আমরা বলতাম ঘামতেল লাগানো হচ্ছে। ষষ্ঠীর দিন ইটাপাড়া থেকে ডাকসাজ নিয়ে আসবে থানাদার শুক্র সোনা। বাবা কলকাতা থেকে এলেন পুজোর কাপড়ের বাজার নিয়ে, সঙ্গে কয়েকটি শারদ সংখ্যার পত্রিকা, কয়েকটি গানের ক্যাটালগ এবং বেশ কয়েকটি গ্রা‌মোফোন রেকর্ড। বাদলকাকুরা তার আগেই আসানসোল থেকে কিনে এনেছেন জগন্ময় মিত্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সুপ্রীতি ঘোষ, সুপ্রভা সরকার, উৎপলা সেন, হেমন্ত মুখার্জির গানের রেকর্ড। বাবাও এনেছেন শচীন দেববর্মণ, সত্য চৌধুরী, সুবীরলাল চক্রবর্তী, শীলা সরকার, দীপালী তালুকদার, কাননবালা, কমলা ঝরিয়ার গানের রেকর্ড।

বাবার কাছে কেনা রেকর্ড ছাড়াও কিছু স্যাম্পল রেকর্ড ছিল। ফাইনাল রেকর্ডিং হওয়ার আগে স্যাম্পল রেকর্ড বের করা হতো। সাদা কাগজের লেবেলে ফাউন্টেন পেনে গানের প্রথম লাইন, গীতিকার ও সুরকারের নাম লেখা থাকতো। এইরকম একটা স্যাম্পল রেকর্ডে ছিল কাজী নজরুলের লেখা কে মল্লিকের গাওয়া একটি আগমনী গান। এই কে মল্লিকের নাম কাশেম মল্লিক, বাড়ি বর্ধমানে, অনেক বয়সে একথা জেনেছিলাম। আমাদের বৈঠকখানায় গ্রামোফোন বাজলেই ছোটোছোটো ছেলেরা ছাড়াও রজনী বাউড়ির ছেলে হরেন্দ্র, যুগল বাউড়ি, চমন সওদাগর, রমজান চাচা, পাড়ার যুবক ভুতুদা, মণীন্দ্রদা, তারাপদকাকু, প্রহ্লাদ ঘোষ এরাও এসে গান শুনতো। পুজোর আগে কাজী নজরুল লিখছেন আগমনী গান, গাইছেন কাশেম ‍‌মল্লিক, শুনছেন রমজান চাচা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এর চেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে? এছাড়াও বাজতো জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর গাওয়া কাজী নজরুলের ‘আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে’ আর ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা’ গান দুটি। ম্যাজেন্টা রঙের লেবেলে ‘চোঙাওয়ালা গ্রামোফোনে গান শুনছে একটি প্রভুভক্ত কুকুর। এই ছাপা ছিল হিজ মাস্টার্স-এর ট্রেড মার্ক। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ ছাড়াও ‘কলম্বিয়া’ রেকর্ড প্রকাশিত হতো। কলম্বিয়াতে গাইতেন হেমন্ত মুখার্জি, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মুখার্জি, আর হিজ মাস্টার্স ভয়েস’- এ গাইতেন শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখার্জি, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমে ভায়োলেট রঙের পরে নীল রঙের লেবেলে বাঘের ছবি আঁকা থাকতো কলম্বিয়া রেকর্ডে। ১৯৩৯সালে বাবা হিজ মাস্টার্সে রেকর্ড করেছিলেন ‘ব্রজের কানাইয়া জাদুকর’ আর ‘রূপে মায়ের ত্রিভুবন আলা’ ঝুমুর গান দুটি। সেই সিরিজেই দীপালী তালুকদার রেকর্ড করে‍‌ছিলেন তাঁর প্রথম গান ‘মেঘ মেদুর বরষায়’ আর ‘রুমঝুম রুমঝুম নূপুর বোলে’ জয়জয়ন্তী আর নটবেহাগ রাগে নিবদ্ধ কাজী নজরুলের লেখা বাংলা খেয়াল দুটি। বাবাকে তিনি এই রেকর্ডটি প্রেজেন্ট করেছিলেন, কভারে তাঁর সই ছিল। সেই রেকর্ডটি এবং কভারটি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হিজ মাস্টার্সের রেকর্ডের নম্বরের আগে ‘এন’ এবং কলম্বিয়ার নম্বরের আগে জি ই লেখা থাকতো, আরেকটি জনপ্রিয় রেকর্ড কোম্পানি থে‍‌কে টুইন রেকর্ড প্রকাশিত হতো। এই রেকর্ড কোম্পানির সাথে প্রখ্যাত সুরকার গিরীন চক্রবর্তী যুক্ত ছিলেন। হলুদ রঙের লেবেলে কালো কালিতে যমজ শিশুর ছবির নিচে গানের লাইন, গীতিকার ও সুরকারের নাম লেখা থাকতো। রেকর্ডের নম্বরের আগে একটি লেখা থাকতো। টুইন কোম্পানি থেকেও নজরুলের বহু গান প্রকাশিত হয়েছিল। গিরীন চক্রবর্তী নজরুলের বেশ কিছু গানে সুর দিয়েছিলেন। টুইন রেকর্ডে নজরুলের কিছু ইসলামী গান প্রকাশিত হয়েছিল, গাইতেন চিত্ত রায়, ধীরেন দাসেরা। নজরুল চিত্ত রায়ের গানকে ইসলামী সমাজে গ্রহণযোগ্য করতে তাঁর নাম দিয়েছিলেন দেলওয়ার হোসেন। নজরুল যেমন গান লেখা ও সুর দেওয়ায় দক্ষ ছিলেন তেমনি রেকর্ডের বাণিজ্য কীভাবে হবে সেটাও ভালো বুঝতেন।

টুইন রেকর্ড থেকে বাবার একটা গান গেয়েছিলেন জ্ঞানপ্রিয়া বৈষ্ণবী, গানটি ছিল ‘ঝুলন খেলায় বাঁশি ফুকারে গো’। উলটো পি‍‌ঠে ছিল নিকুঞ্জ চক্রবর্তীর লেখা বাবার সুর দেওয়া ‘কানে গুঁজে ধুতুরার ফুল গো’, পুজোর দিনগুলিতে দুপুরে মা-পিসিমা শুনতেন পালা রেকর্ড। সেনোলা রেকর্ডে ‘উমার তপস্যা’ আর রিগ্যাল রেকর্ডে’ দস্যু রত্নাকর’ নামে আমাদের দুটো পালা ছিল। ‘উমার তপস্যা’ ছিল চারটি রেক‍‌র্ডে আর ‘দস্যু রত্নাকর’ ছিল তিনটি রেকর্ডে। সেনোলার লেবেল ছিল হালকা সবুজ রঙের কাগজের উপর ময়ূরের ছবি। এতে নবদ্বীপ হালদার বেশ কিছু কমিক গানের রেকর্ড করেছিলেন। আমাদের বাড়িতে ছিল ‘ফ‌্যান্তা ফ‌্যাচাং তরকারি’ আর ‘শরীরটা আজ বেজায় খারাপ’ গান দুটির একটি রেকর্ড। রিগ্যাল রেকর্ডের লেবেলের রঙ ছিল হিজ মাস্টার্স ভয়েসের মতোই আগুন রঙের বা ম্যাজেন্টা রঙের। তবে কোনো ছাপ থাকতো না। বাদলকাকুর বাড়িতে ছিল হিজ মাস্টার্স ভয়েসের ‘লক্ষণ ঊর্মিলা’ পালা। এই পালার ‘ভুলি নাই, ভুলি নাই, আজো মনে পড়ে নাম ধরে ডাকা’। গানটি আমাদের বন্ধু নব গলায় তুলে নিতে পেরেছিল। আর সে গাইতো কলম্বিয়া রেকর্ডে কানন দেবীর গাওয়া ‘মেজদিদি’ ফিল্মের গান ‘প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম’। গানটি আমাকেও ডুয়েটে তার সাথে গাইতে হতো। আমরা তখন ক্লাস সিক্স সেভেন-এর ছাত্র। রিগ্যাল রেকর্ড থেকেও বাবার দু’খানি গান ‘খেলা খেলিব রে’ আর ‘কাল কেউটে সাপালি’ প্রকাশিত হয়েছিল।

‘উদয়ের পথে’ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। গানটি পাইওনিয়ার রেকর্ড থেকেও প্রকাশিত হয়েছিল। বড় সুন্দর ছিল পাইওনিয়ার রেকর্ডের লেবেলটি। একটি বহুবর্ণে চিত্রিত লেবেলে একটি উড্ডীয়মান মরালের ছবি আঁকা থাকতো। আমাদের বাড়িতে পাইওনিয়ার কোম্পানির দু’খানা রেকর্ড ছিল। আমি নয়ন ভরে এর লেবেলটি দেখতাম, আর দেখতাম! ‘উদয়ের পথে’ ফিল্ম এবং ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ গান এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে চুরুলিয়ার সাধুরা তাঁদের গৌরাংডি-বরাকর রুটের বাসের নাম রাখলেন ‘উদয়ের পথে’। আর রাস্তাঘাটে লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগলো রবীন্দ্রনাথের গান। মেগাফোন থেকে জে এন জি নম্বর সংবলিত হালকা সবুজ রঙের কাগজে হরিণের ছবি আঁকা লেবেল দেওয়া রেকর্ডে নজরুলের নিজের গলায় গাওয়া ‘পাষাণের ভাঙালে ঘুম’ রেকর্ডটিও আমাদের — বাড়িতে ছিল। তুলসী লাহিড়ীর লেখা কিছু গান মেগাফোনে রেকর্ড হয়েছিল। কমলা ঝরিয়া মেগাফোনেই গাইতেন। তাঁর গাওয়া কীর্তন গানের কিছু রেকর্ড আমাদের বাড়িতে ছিল। মেগাফোনে বাবার লেখা ‘আমি তার মূল্য দিব ধরে’ এবং ‘ব্রজপুরে কত সহি জালাতন’ গান দুটি রেকর্ড হয়েছিল।

শচীন দেববর্মণ গাইতেন হিন্দুস্থান রেকর্ডে। তাঁর নামের আগে কুমার লেখা থাকতো, কারণ তিনি ছিলেন ত্রিপুরার রাজকুমার। ‘প্রেমের সমাধি তীরে নেমে এলো শুভ্র মেঘের দল’ এবং ‘আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে’ গান দুটির রেকর্ডও ছিল আমাদের বাড়িতে। হিন্দুস্থান রেকর্ডের লেবেলে বরাবর বংশীবাদন-রত একটি বালকের ছবি থাকতো। পরবর্তীকালে পূর্ণদাস বাউল এবং অংশুমান রায় হিন্দুস্থানেই রেকর্ড করতেন। শচীন দেববর্মণ হিজ মাস্টার্স ভয়েসে প্রথম রেকর্ড করেন ১৯৫৬সালে পুজো সংখ্যা। গান দুটি ছিল ‘মন দিল না বধূ’ আর ‘তুমি আর নেই সে তুমি’। বাদলকাকু ছিলেন হেমন্ত মুখার্জির ফ্যান। তিনি কলম্বিয়া রেকর্ডে হেমন্ত মুখার্জি আর সন্ধ্যা মুখার্জির গান বেশি কিনতেন। তিনি তাঁর দোতলার রুমে গ্রা‌মোফোন বাজাতেন আর আমাদের ডেকে ডেকে শোনাতেন হেমন্ত মুখার্জির ‘আকাশ মাটি ওই ঘুমালো’, শোনাতেন ‘গাঁয়ের বধূ’। তাঁর কাছে শুনলাম সুপ্রীতি ঘোষের গাওয়া ‘আকাশে লক্ষ তারার দেয়ালী/পলাশের মনে রঙের হেঁয়ালী/বলতো, বলতো দোষ কি এমন/ওগো বলতো/বলতো দোষ কি এমন হয় যদি মন হঠাৎ কিছু খেয়ালী।’ শুনলাম সত্য চৌধুরীর গাওয়া মোহিনী চৌধুরীর গান ‘পৃথিবী আমারে চায়’। নব শিখে নিলো জগন্ময় মিত্রের গান ‘তুমি আজ কত দূরে’ গানটি। নবমীর রাত। ফুটবল মাঠের আমরা চার বন্ধু। জ্যোৎস্না নেমেছে পাহাড়ীর জঙ্গলে, নব গেয়ে চলেছে জগন্ময় মিত্রের ‘চিঠি’ আর ‘সাতটি বছর আগে’ ‘সাতটি বছর পরে’ গানগুলি! সে স্মৃতি‍‌ ভোলার নয়। গান দুটির প্রথম লাইন ছিল ‘এমনি শারদ রাতে’ পুজোয় কলকাতা থেকে এসেছেন ছকুকাকু—সাদা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি, সাদা নিউকাট, সাদা ঘড়ির বেল্ট, রিমলেশ চশমা পরে। বাবার সাথে বৈঠকখানায় গাইছেন ‘ওগো নদী আপন বেগে পাগল পারা’ আর গাইছেন সুধীরলাল চক্রবর্তীর বিখ্যাত গান ‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে —’ বোধহয় ‘দাগ’ কথাচিত্রের গান। ছকুকাকু বাদলকাকুদের পিসতুতো ভাই নলিনীকাকুর সাথে এসেছেন তাঁর শ্যালিকা, আমাদের বুজু মাসি। তখন ফ্রক পরে বেনি দুলোয় বাবার কাছে গানটি তুলে নিচ্ছেন। বুজুমাসি সুধীরলালের ফ্যান শুনে বাদলকাকু কিনে আনলেন ‘স্বপ্ন সুরভি মাখা দুর্লভ রাত্রি’ আর ‘খেলাঘর মোর ভেসে গেছে হায় নয়নের যমুনায় —’ গান দুটি। পানুড়িয়ার সোনেলাল শিখে নিয়ে এই গান দুটির সাথে ‘গরমিল’ ছবিতে রবীন মজুমদারের গাওয়া ‘এই কি গো শেষ দান’ গানটি তুলেছেন। পুজোর বৈঠকী গানের আসরে তখন তাঁকে নিয়ে টানাটানি। এই গানগুলিই তিনি গাইছেন সব আসরে।

বাবা অকাল প্রয়াত হয়েছেন। বাদলকাকুও। অমন একজন দুর্দান্ত ফুটবল প্লেয়ার, খেলার জন্যই যাঁর চিত্তরঞ্জনে চাকরি, তিনি মাত্র বাইশ বছর বয়সে চলে গেলেন।

গ্রামোফোন দুটিও খারাপ হয়ে গেল।

স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ছি। বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট আউটের দিন। আমরা বাইরে ঘোরাফেরা করছি। ডিসেম্বরের রোদে গা সেঁকে নিচ্ছি। স্কুল সংলগ্ন ক্লাবের বারান্দায় জমিদার বাড়ির হারুদা তাঁদের ঢাউস টেবিল গ্রামোফোনখানা নিয়ে নতুন রেকর্ড বাজাচ্ছেন, নতুন ধরনের গান— ‘ধিতাং ধিতাং বোলে/ কে মাদলে তান তোলে/ কার আনন্দ উচ্ছলে/ আকাশ ভরে জোছনায়।’ সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে — হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইছেন সে গান। মানিকদা বলছেন, ‘গণনাট্য দেখছি বাংলা গানেও নতুন দিক নিয়ে এলো! দেখো কথা কত সুন্দর— এদেশ তোমার আমার/ আমরা ভরি খামার/ আমরা গড়ি স্বপন দিয়ে সোনার কামনায়।’ সঙ্গে সঙ্গে গানটা গলায় তুলে নিলাম! সন্ধ্যা মুখার্জির নতুন গান বাজছে ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে!’ বিমলচন্দ্র ঘোষের কবিতায় সলিল চৌধুরী সুর দিয়েছেন, সন্ধ্যা মুখার্জি গাইছেন, ‘উজ্জ্বল, এক ঝাঁক পায়রা/ সূর্যের উজ্জ্বল রৌদ্রে/ চঞ্চল পাখনায় উড়ছে।’ নকুলকে বলছেন, ‘এ ধরনের কথায় সুর দিয়ে যে গান হতে পারে একথা ভাবিনি তো!’ পানুদা চটুল গান পছন্দ করেন না। নতুন নতুন কথা ও সুরে হিজ মাস্টার্স ভয়েস আর কলম্বিয়ায় গাইছেন ধনঞ্জয়, হেমন্ত, শ্যামল, মানবেন্দ্র, তরুণ, দ্বিজেন, সতীনাথ, পান্নালাল, অখিলবন্ধু, মৃণাল চক্রবর্তী, অপরেশ লাহিড়ী, সন্ধ্যা, আলপনা, প্রতিমা, মাধুরী, উৎপলা, গীতা রায় (দত্ত), গাইছেন শচীন দেববর্মণ আর মান্না দে। যে বছর শচীন দেব বর্মণ ‘মন দিল না বঁধূ’ রেকর্ড করলেন এইচ এম ভি-তে সেই বছরই কলম্বিয়ায় পান্নালাল গাইলেন ‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা!’ মাঠে, ঘাটে, মাইকে, ফাংশনে সর্বত্র ঘুরতে লাগল সেই গান। একটা শ্যামাসঙ্গীত যে এতটা জনপ্রিয় হতে পারে ভাবা যায় না। রেকর্ড সংখ্যক রেকর্ড বিক্রি হলো। সে বছরই হেমন্ত রেকর্ড করেছিলেন’ ‘আর কতো রহিব শুধু পথ চেয়ে।’ যে ধনঞ্জয় তাঁর প্রথম রেকর্ড করেছিলেন ভারত রেকর্ডে— ‘ভুলে যাও মোরে’— অনেকটা জগন্ময়- সুবীরলাল — রবীন মজুমদারদের স্টাইলে, তিনিই আবার ‘সলিল চৌধুরীর সুরে ‘পাশের বাড়ি’ ফিল্মে গাইলেন — ‘ঝির ঝির ঝির ঝির বরষা/ আমার হয় কি গো ভরসা/ আমার ভাঙা ঘরে তুমি বিনে!’

বন্ধু দুলাল মিত্র নেমন্তন্ন করলো গান শোনার তাদের ক্লাব বাংলোর কোয়ার্টারে। আমরা তখন ফাস্ট ক্লাসের অর্থাৎ ক্লাস টেনের ছাত্র। শুনলাল— শ্যামল মিত্র’র ‘মহুল ফু‍‌লে জমেছে মউ,’ মান্না দে-র ‘তুমি আর ডেকে না!’ ‘এ জীবনে যত ব্যথা পেয়েছি।’ সতীনাথের ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন/ কে কার অলঙ্কার!’ উলটোপিঠে ‘এলো বরষা যে সহসা মনে তাই।’

গান গেয়ে আর গান শুনে এভাবে‍‌ই কেটে যায় দিন। রেডিও তখন জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। বাজারে তখন অনেকেই রেডিও কিনেছেন, কিন্তু গ্রামোফোনের সে স্বাদ, রেডিওতে কোথায়? সলিল চৌধুরী গান বাঁধছেন, ‘তখন এ গান, তু‍‌লে তুফান, নবীন প্রাণের প্লাবন আনে দিকে দিকে/ কিসের বাধা, মরণ হরণ চরণ ফেলে সে যায় হেঁকে।’ চাঁদ ফুল জোছনা ছাড়াই, গুণ গুণ গুঞ্জন বাদ দিয়েও, ‍‌প্রেমের ডোর খুলে ফেলেও পথে নেমে মানুষের হাতে হাত দিয়ে যে গান গাওয়া যায় সলিল চৌধুরী তা প্রমাণ করলেন, বললেন— ‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি।’ তারও অনেক পরে ব‍‌লেছেন, ‘আমি পথ খুঁজি না তো, পথ মোরে খোঁজে।’ কী সুন্দর অ‌্যালিটারেশন, সিমিলি, মেটাফরের ছড়াছড়ি বাংলা গানে! সুবীর সেন গাইছেন, ‘ছুটে আয়রে মিলন বীণ, ঐ তো তুলেছে তান/ শোনো আহ্বান।’

মনে পড়ে, তখন সেকেন্ড ইয়ার, মানে আজকের বারো ক্লাসের ছাত্র। যে বাসে কলেজ যেতাম, সেই একই বাসে যেত জয়শ্রী, ক্লাস টেনে পড়তো। শ্যামলা, ছিপছিপে শুচিস্মিতা মেয়েটিকে দেখলেই মনটা পবিত্র হয়ে যেত। সে বছর শ্যামল মিত্র পুজোতে রেকর্ড করলেন ‘কার মঞ্জির বাজে রিনিঠিনিঠিনি।’ আর ‘চোখের নজর কম হলে আর কাজল দিয়ে কী হবে।’ গান দুটো গলায় তুলতেই হলো। কলেজের কমনরুমে যখন প্রথম গানটার অন্তরা গাইতাম, ‘তুমি যে আমার চোখের আলো/ প্রথম দেখায় আমি বেসেছি ভালো’ তখন কেন জানে না, জয়শ্রীর হাসিমুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠতো। সে যেদিন মন খারাপ করে মুখ ভার করে থাকতো, সেদিন মনে মনে গাইতাম শচীন দেববর্মণের গান’ তোমার চোখের পাতা নাচে না/ নাচে না আমার পথ চেয়ে/ তোমার হাসিতে সাড়া জাগে না/ জাগে না আমার সাড়া পেয়ে/ হাসো না হাসো না সে হাসি মধুময়/ তুমি আর নেই সে তুমি।’ জয়শ্রী জানতো না সে কথা! জানে না এখনো।

তারপর কেটে গেছে কত কাল! এখন কালো কালো গোল গোল রেকর্ডগুলো স্থান পেয়েছে অমিত গুহ-র সংগ্রহশালায়, আমার ছেলেমেয়েরাও সেই ছোট ছোট পিনগুলো দেখেনি। চোঙাওলা বা বক্স গ্রামোফোন‍‌ও তাদের কাছে জাদুঘরের সামগ্রী। এভাবেই পুরাতন বিদায় নেয়। আসে নতুনেরা, এসে গেছে নতুন নতুন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র। স্বাগত জানাতেই হবে— কিন্তু আর কী করে শুনবো তরুণের সেই গান— ‘কাজল নদীর জলে’/ ভরা ঢেউ ছলো ছলে/ প্রদীপ ভাসাও কারে স্মরিয়া,’ বা ‘ওগো কৃষ্ণচূড়া বলো আবার কবে তুমি চাঁদের আলোয় যাবে ভরে!’ কিংবা উৎপলা সেনের ‘ঝিকমিক জোনাকির দীপ 
 জ্বলে শিয়রে!’ ‘আমার এ গানে স্বপ্ন যদি আনে আঁখি পল্লব ছায়/ ছন্দভরা রাতে স্বপ্ন দেখে যাব/ তুমি আমি দু’জনায়। কোথায় পাবো, শ্যামল মিত্রের ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা’ ‘চৈতালী চাঁদ যাক, যাক ডুবে যাক।’ সেসব রেকর্ড হারিয়ে গেলেও মনের রেকর্ড থেকে মুছে ফেলা যাবে না কোনোদিন।
সৌজন্যেঃ- গণশক্তি (সম​য়ের সাথে)