Sunday, June 24, 2012

মীমাংসা করে বরং শিল্পই হোক, চাইছেন অনেক ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকও


মীমাংসা করে বরং শিল্পই হোক,
চাইছেন অনেক ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকও

নিজস্ব সংবাদদাতা

সিঙ্গুর, ২৩শে জুন — সাহানাপাড়ার মানব পাঁজা অবশেষে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাস বইয়ের প্রথম পাতার জেরক্স করলেন।
খুঁজে বের করেছেন তিনি গতবছরের জুন-জুলাই মাসের দরখাস্তের ‘রিসিভড্‌ কপি’-ও।
তিনি যে সিঙ্গুরের ‘অনিচ্ছুক’ কৃষক, জমির বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ যে এখনও নেননি, তিনি জমি ফেরত চান, সেই মর্মে সিঙ্গুর বিডিও অফিসে গতবছর জুন-জুলাইয়ে হলফনামার মতো দরখাস্ত দিতে হয়েছিল। তখন তো রব উঠে গিয়েছিল, জমি ফেরত হয়ে যাবে এবার... আইন পাস হয়ে গেছে বিধানসভায়... আর কে আটকায়... অনিচ্ছুকরা এবার বিডিও অফিসে দরখাস্ত দিন... জমি ফেরত হবে...।
দরখাস্ত জমা পড়ছিল সেইসময়ে। যদিও পরে দেখা গিয়েছিল মাত্র ৪০ একরের জমিতে ‘অনিচ্ছুক’ কৃষক। মানব পাঁজা তাঁদেরই একজন। গতবছরের সেই দরখাস্তের ‘রিসিভড্‌ কপি’ ও বের করেছেন তিনি। জেরক্স করবেন।
এগুলি এখন লাগবে। যদি সিঙ্গুরের ‘অনিচ্ছুক’ জমিদাতাদের মাসে হাজার টাকা ভাতা পেতে হয়, ২ টাকা কেজি দরে চাল পেতে হয়, তাহলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পাস বইয়ের প্রথম পাতার জেরক্স ও সেই দরখাস্তের জেরক্স এখন জমা দিতে হবে বিডিও অফিসে। নামের তালিকা হচ্ছে। এগুলি তাই এখন চাই।
তালিকা অবশ্য অনেকদিন ধরেই জানানো হচ্ছে! কিন্তু অনিচ্ছুক হলেও মানব পাঁজা এতদিন ওইসব কাগজপত্র জমা দেননি। দেননি কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিলো, কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিসন বে‍‌ঞ্চে জিতে যাবে ‘দিদি’র সিঙ্গুর আইন। ফলে মানব পাঁজা মনে করছেন, জমি ফেরত দূর অস্ত। ওই হাজার টাকা ভাতা আর দু’টাকা কেজি চাল অতএব না নিয়ে উপায় নেই। তাই অবশেষে শনিবার তিনি কাগজপত্র জেরক্স করালেন। বিডিও অফিসে জমা দেবেন বলে।
মানব পাঁজা শুধু ‘অনিচ্ছুক’ বললে ভুল হবে। তাঁর আরো একটি পরিচয় আছে। তাঁর স্ত্রী সুষমা পাঁজা সিঙ্গুর পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচিত তৃণমূলী সদস্যা। অন্যতম কর্মধ্যক্ষও বটে। এ হেন মানব পাঁজার পরিবারও আর ভরসা রাখতে পারছেন না ‘দিদি’র উপর। সে তিনি এখন যতই সুপ্রিম কোর্টে যান না কেন। মানব পাঁজারা বুঝেছেন আশা নেই!
আরেক ‘অনিচ্ছুক’ জমিদাতা ঝন্টু ধাওয়া তো সরাসরি পাড়া প্রতিবেশীদের বলছেন, ‘সুপ্রিমকোর্টে যাওয়ার কী দরকার?’ তিন বিঘা জমি তাঁর গিয়েছে প্রোজেক্ট এলাকায়। টাকা নেননি এতদিন জমি ফেরতের আশায়। কলকাতা হাইকোর্টের রায় তার ভরসাকে ভেঙে দিয়েছে। রায় শুনে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিলো, ‘সর্বনাশ হ‍‌য়ে গেল!’ এখন তিনি বলছেন, সুপ্রিমকোর্টে না গিয়ে আলোচনা করে শিল্প কিছু করার কথা কি ভাবা যায় না!’ প্রবল হতাশ দেখায় তাঁকে।
ক্ষুদিরাম সাহানার প্রশ্ন, হাইকোর্টের হারেই প্রমাণ হয়ে গেছে ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক বলে কিছু হয় না। তাহলে ১০০০ টাকা ভাতা আর ২ টাকা কেজির চাল সবাই পাবে না কেন? পাঁচ ভাইয়ের সংসারে তিনি লরিতে মাল ওঠা-নামানোর কাজ করেন। তবে ভাতা আর চাল দিয়ে কি সংসার চলবে? হাজার টাকা ভাতা ভাগ হয়ে যাবে মা-বোন-দিদি-ভাইয়ের মধ্যে। ভাগে কী থাকবে একেকজনের? ৮ কেজি চালে মাস চলবে?
সব মিলিয়ে এভাবেই হতাশা আর প্রশ্ন সিঙ্গুরে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের পর। স্থানীয় প্রশাসনের অবশ্য এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। সিঙ্গুর থানার ঘুম ছুটেছে একটি চিঠি পেয়ে। এম কে পি নামে নকশালপন্থী সংগঠন সিঙ্গুর থানায় চিঠি দিয়েছে। তাতে জানানো হয়েছে, আগামী ৫ ও ৬ই জুলাই ওই সংগঠন সিঙ্গুর থেকে নোনাডাঙা মিছিল করবে। হাওড়া হয়ে যাবে সেই মিছিল।
এই নিয়েই এখন মাথাব্যথা সিঙ্গুরের স্থানীয় প্রশাসনের।

No comments:

Post a Comment