Thursday, October 25, 2012

মহিলা নির্যাতন রোধ নয়, অন্ধবিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখতে অর্থ বরাদ্দ করে কর্ণাটক সরকার




  মহিলা নির্যাতন রোধ নয়, অন্ধবিশ্বাস অক্ষুণ্ণ  রাখতে অর্থ বরাদ্দ করে কর্ণাটক সরকার  


‘‘আমাকে এখানে আরও একমাস বসবাস করতে হবে। তারপর আমাকে স্নান করে মন্দিরে যেতে হবে, সেখানে আমার সন্তানের নামকরণ হবে। শুধুমাত্র তারপরেই আমি বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি পাবো।’’ মাত্র ২০ দিনের সন্তানের মা জয়াম্মা, ছোট্ট ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এসে এই কথাগুলি জানালেন। ভরা বর্ষায় গ্রাম থেকে দূরে চাষের জমির মাঝে একাকী দিন কাটাচ্ছেন। বাড়ির লোকজন তাঁর খাবার ঝুপড়ির পাশে রেখে চলে যায় বা থালায় ফেলে দেয়। যাতে তারা ‘‘দূষিত’’ না হয়ে যায়। কর্ণাটকের হিরিয়ুর তালুকের দিণ্ডাভারা পঞ্চায়েতের অন্তর্গত সুরাপ্পানাহাট্টিতে কাডু গোল্লা পশুপালক গোষ্ঠীর ২০০ ঘরের বসবাস। জয়াম্মা সেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন। কর্ণাটকে গোল্লা বা পশুপালক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বিভাজন রয়েছে। প্রধান দু’টি ভাগ হলো ‘‘ওরু গোল্লা এবং ‘‘কাডু গোল্লা’’। উত্তর ভারতের যাদব সম্প্রদায় থেকে এদের উৎপত্তি বলে কথিত রয়েছে। ওরু গোল্লা গোষ্ঠীর মানুষজন শহরাঞ্চলে বাসস্থান গড়লেও, বিপরীতে কাডু গোল্লা সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে নিজস্ব ক্ষুদ্রপল্লী গঠন করে যা হাট্টি বলে পরিচিত। মূলত শহরের প্রান্তে বা বৃহৎ গ্রামাঞ্চলের, এমনকি জঙ্গল ঘেঁষা অঞ্চলে তারা এই পল্লী নির্মাণ করে। কাঁটা‍ঝোপের বেড়া দিয়ে ঘেরা এদের বাসস্থানকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

যাযাবর প্রকৃতির এই কাডু গোল্লা সম্প্রদায়ের মানুষ অতীতে গোরু ও ছাগল পালন করতেন। ইতোমধ্যে স্বল্পসংখ্যক মানুষ ক্ষুদ্র জমির মালিকানা লাভে সমর্থ হয়েছেন। শিক্ষিত অংশটি শহর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। এদের মূলত চিত্রদুর্গ ও টুমকুর জেলায় দেখা যায়। এছাড়াও এদের উল্লেখযোগ্য অংশকে পার্শ্ববর্তী হাসান জেলায় দেখতে পাওয়া যায়। বিচ্ছিন্নভাবে কর্ণাটকজুড়েই এদের লক্ষ্য করা যাবে এবং অন্ধ্র প্রদেশের কিছু অংশেও তারা বসবাস করেন । ১৯৯০ সালে কর্ণাটকের তৃতীয় অনগ্রসর শ্রেণী কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে গোল্লারা হলো রাজ্যের ১.৩শতাংশ জনগণ। এরমধ্যে কাডু গোল্লাদের শতাংশ পৃথকভাবে না থাকলেও অনগ্রসর শ্রেণী ও সংখ্যালঘু মন্ত্রকের হিসেবে চিত্রদুর্গ জেলায় প্রায় ২৫১টি কাডু গোল্লা পল্লী রয়েছে। যার জনসংখ্যা প্রায় ১লক্ষ। সংলগ্ন জেলাগুলির হিসাব যোগ করলে কর্ণাটকে এই জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান প্রায় ৩লক্ষ দাঁড়াবে। অত্যন্ত ধর্মভীরু এই সম্প্রদায় সমাজের মূলস্রোত থেকে নিজেদের পৃথক করে রেখে নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বাতাবরণকে অনেকখানি বহির্প্রভাব থেকে রক্ষার নামে সামাজিক কুপ্রথাকে লালন করে যেতে সক্ষম হচ্ছে। যার মূল শিকার হচ্ছেন সমাজের মহিলারা। কর্ণাটকের কুভেম্পু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এম গুরুলিঙ্গাইয়া তাঁর উপজাতি সংস্কৃতি সংক্রান্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন — ‘‘এরা মনে করে যে তাদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রিত ও পরিপুষ্ঠ হয় একধরনের অপ্রাকৃতিক, আত্মিক ও জাদুশক্তির দ্বারা। কাডু গোল্লাদের সমগ্র জীবনধারাটি ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলা যায়। এরা বিভিন্ন দেব-দেবী, আত্মা ও ভূত-প্রেতে আস্থা রাখে, যা তাদের সমগ্র জীবনপ্রণালীকে নির্দেশিত করে থাকে।’’

কাডু গোল্লাদের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে একটা অস্বাভাবিক ধারণা রয়েছে। তারা মনে করে কোনো মহিলা তার ঋতুচক্রের সময়পর্বে বা সন্তানপ্রসবের পরবর্তীতে সে অশুদ্ধ। সেই সময় তাকে গ্রামের বাইরে তিন থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত থাকতে হবে প্রতিমাসে। প্রসূতি মহিলাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা দু’ থেকে তিন মাস পর্যন্ত গড়ায়। এই পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মীয় সমাজে ঋতুচক্রের মতো জৈব প্রক্রিয়া ‘‘অভিশাপ’’, যার পরিণতিস্বরূপ রক্তপাত হয়। এই ধারণা এতটাই বদ্ধমূল কাডু গোল্লা সমাজে যে এমনকি সম্প্রদায়ভুক্ত শিক্ষিত পেশাজীবী মানুষরাও এই মতকে গ্রহণ করেন। চিত্রদুর্গ জেলার চাল্লাকেরে শহরের সরকারী কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এইচ আজ্জাইয়ার মন্তব্য — ‘‘আমরা যখন হাট্টিতে ফিরে যাই, আমাদেরকে বিশুদ্ধতা সংক্রান্ত নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয়।’’ — এই ধারণাকেই পুষ্ট করে, যদিও গ্রামীণ হাট্টির তুলনায় শহর সংলগ্ন হাট্টিগুলিতে এই অন্ধ কুসংস্কার তুলনামূলক কম বলে অনেকে মনে করেন। চাল্লাকেরে শহরের কাটাপুনো হাট্টিতে এ ধরনের অন্ধ কুসংস্কার মানা হয় না বলে অনেকে বলে থাকেন।

কর্ণাটকে গোল্লা সম্প্রদায় ‘‘যাযাবর ও প্রায় ভবঘুরে আদিবাসী’’ হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯০-র দশকের প্রথমভাগে গোষ্ঠীর লোকজন রাজ্যজুড়ে মিছিল করলে কর্ণাটক সরকার ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাদেরকে সবচেয়ে অনগ্রসর আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শিক্ষা ও সরকারী চাকরিতে ৪ শতাংশ সংরক্ষণ ঘোষণা করে। কাডু গোল্লারা তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এদের মধ্যেকার কুসংস্কার দূর করে মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধান ও শিশুমৃত্যুর হার রোধ করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু তারা যেকোন স্বাস্থ্য কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার কথাই জানিয়েছেন। এমনকি মাত্র ৩০ বছর বয়সী মহিলারাও হিস্টেরকটমি অপারেশন করাচ্ছেন। প্রসূতি মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনেও কোন গ্রামবাসী তাঁকে স্পর্শ করেন না। স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিজ্ঞতা হলো যে, গ্রামের সর্বত্র ঘুরে যাওয়ার পরেই গ্রামের বাইরের ঝুপড়িতে অবস্থানরত মহিলাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে।

এই ঘৃণ্য কুসংস্কার থেকে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জনগণকে মুক্ত করার কোনো সরকারী উদ্যোগ না থাকলেও ‘‘মহিলা ভবন’’ গ‍‌ড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা অনুসারে বিভিন্ন হাট্টিতে তা তৈরি করা হচ্ছে কাডু গোল্লাদের ‘‘অভিনব সাংস্কৃতিক প্রথা’’কে সম্মান জানিয়ে। শুধু চিত্রদুর্গ জেলায় ইতোমধ্যে ১৩টি মহিলা ভবন গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ৬৫লক্ষ টাকা ব্যয় করে। আবার গ্রাম পঞ্চায়েত অনেক ক্ষেত্রে এই নবনির্বিত গৃহকে পঞ্চায়েতের সম্পত্তি বলে ঘোষণা করছে, মহিলা ভবন নয়। কর্ণাটক সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সমালোচিত হচ্ছে। আদতে এই ঘরগুলি অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এবং মহিলাদের প্রতি পরিহাসস্বরূপ এই ঘটনা আধুনিক ভারতের যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে তা মর্মান্তিক। যাদব সম্প্রদায়কে শিক্ষিত করে তুলে এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও সনাতন প্রথা থেকে বের করে আনার উদ্যোগ না গ্রহণ করে সস্তা সমর্থন লাভের আশায় যে কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে তা সমস্ত অংশের যুক্তিবাদী জনমতের পক্ষে নিন্দা করা হয়েছে। বিভিন্ন মহিলা সংগঠনের পক্ষে দাবি জানানো হয়েছে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের বাসস্থান এলাকাগুলিকে রাজস্ব গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করে বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পের সুযোগ তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে শিক্ষার ও স্বাস্থ্যের মান বাড়িতে তুলতে হবে। চিত্রদুর্গ, টুমকুর, হাসানের রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত বাসস্ট্যান্ড, গাছতলা, পরিত্যক্ত বাড়ি, গোয়ালঘর এমনকি খোলা আকাশের নিচে বা ছোট্ট ঝুপড়িতে মহিলারা দিন কাটাচ্ছেন দেখতে পাওয়া যাবে। যদিও আজকের দিনে ঐ সম্প্রদায়েরই মহিলা ও যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু প্রবীণ জনমত ও পুরোহিতরা এই ঘৃণ্য প্রথাকে মদত জোগাচ্ছে। সংস্কারের পক্ষে যখন মনোভাব জোরালো হচ্ছে, তখন রাজ্য সরকারকে অবশ্যই নীতি গ্রহণ করতে হবে যা এই প্রথাকে দূর করতে সহায়ক হবে। সংস্কারকদের পক্ষ গ্রহণ করতে হবে কুপ্রথাকে মদত জোগানোর পরিবর্তে। 


সৌজন্যেঃ- গণশক্তি (সম​য়ের সাথে)

No comments:

Post a Comment